Monday, August 14, 2017

একটু ভুল বোঝাবুঝি.......... অতপর

নিজের রাগ করার ক্ষমতা দেখে আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি । রীতিমত কাঁপছি আমি রাগে কারনে । বারবার মনে হচ্ছে আমি কি আসলেই আমি । এই রাগের উৎস কোথায় আমি ঠিক বলতে পারবো না তবে কেবল এই মুহুর্তে আমার মনে আর কিছু আসছে না । আমার কেবল মনে হচ্ছে সামনে বসা ঐ হারামজাদাকে মেরে হাত পা ভেঙ্গে দিতে । এরিসার মুখোমুখি বসা বদমাস টাকে কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না ।
আমি নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালাম । সোজা হাটতে লাগলাম ওদের দুজনের দিকে । রেস্টুরেন্টটা এমনিতেই একটু অন্ধকার অন্ধকার । এই জন্য ওরা আমাকে ঠিক লক্ষ্য করে নি । কিন্তু একটু কাছে যেতেই এরিসা আমাকে দেখতে পেল । আমাকে দেখেই ওর মুখ থেকে রক্ত সরে গেল । সামনে বসা বদমাইশটাও এরিসার এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে চট করে আমার দিকে তাকিয়ে ফেলল । কিন্তু ততক্ষনে দেরি হয়ে গেছে । আমি একেবারে ওদের কাছে চলে এসেছি । ওর বসা অবস্থায় আমি ঠিক ওর কোমর বরাবর জোড়ে একটা লাথি মারলাম । তাল সামলাতে না পেরে সোজা সামনের দিকে চেয়ার নিয়ে পড়তো । এতো জোরে আওয়াজ হল যে রেস্টুরেন্টের সব কয়টা চোখ আমাদের দিকে ঘুরে গেছে । এরিসা উঠে এসে আমাকে বলার চেষ্টা করলো
-প্লিজ এখানে কোন সিন ক্রিয়েট কর না ।
আমি কোন কথা না বলে কেবল এরিসার দিকে তাকালাম । অনেক কষ্টে এরিসাকে চড় মারার ইচ্ছেটা সংবরন করলাম । কিন্তু আমার চোখ দিয়ে সেই রাগ বেরুচ্ছিলো । এরিসা আর কোন কথা বলতে সাহস পেল না । কেবল অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো । আমার এই রূপ ও আগে আর কোন দিন দেখে নি ।
আমি আবার মাটি পড়ে থাকা বদমাইশটার দিকে ফিরলাম । আমার মনে সমস্ত রাগ গিয়ে পড়লো ওর উপর । ও ততক্ষনে উঠার চেষ্টা করছে । এবার লাথিটা মারলাম কাধের কাছে । যতটুকু উঠেছিল আবার পড়ে গেল । ততক্ষনে চারপাশে ভীড় জমে গেছে । ম্যানেজার ছুটে এল । আমাদের থামানোর জন্য । আমি কিছু না বলে কেবল বদমাইশটার কলার চেপে ধরে টানতে টানতে রেস্টুরেন্টের বাইরে নিয়ে গেলাম । আমার হাত ছাড়ানোর জন্য ততক্ষনে সে জোড়াজুড়ি শুরু করে দিয়েছে । দরজার কাছেই গায়ের সব শক্তি দিয়ে একটা চড় মারলাম । এতো জোরেই চড়টা মেরেছি যে আমার নিজের হাতই জ্বলাপোড়া শুরু করে দিল । চড়টা খেয়ে সোজা উল্টে গিয়ে পড়লো রাস্তার পাশে । কিছুক্ষন পরেই রইলো । ততক্ষনে চারিপাশে মানুষ জড় হয়ে গেছে । রেস্টুরেন্ট থেকেও অনেকে উকি ঝুকি মারছে । আমি ওকে আবার তুলতে যাবো তখনই বেটা উঠে সোজা দৌড় মাড়লো । চোখ পলকে হারিয়ে গেল ভীড়ের ভেতরে । আমি এরিসা দিকে তাকিয়ে দেখি ও কেমন মুখ করে দরজার কাছে দাড়িয়ে আছে । আমার রাগ তখনও কমে ননি । একবার ইচ্ছে হল দুটো থাপ্পড় মারি । তখন হয়তো মেজাজ টা একটু শান্ত হবে । এতো বড় সাহস আমার পিছে অন্য ছেলের সাথে টাংকি মারে ।
আমি ওর চারিদিকে তাকিয়ে কেবল বললাম
-চাবি কোথায় ?
ও ব্যাগ থেকে গাড়ির চাবি বের করে দিল । আর কোন কথা না বলে কেবল গাড়ি গিয়ে বসলাম । পেছন পেছন ও নিজেও এল, নিজেই দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসলো । যখন বাসায় আসলাম তখনও এরিসা কোন কথা বলে নি । বসার ঘরে এসে প্রথম কথা টা বলল
-তুমি এমন টা না করলেও পারতে ?
খুব কষ্টে নিজের রাগ টা কে নিয়ন্ত্রন করলাম ।
ডাইনিং টেবিলে উপরে কয়েকটা গ্লাস ছিল এক টানে ফেলেদিলাম । চারিদিকে ভাঙ্গা কাঁচ ছড়িয়ে পড়লো । এরিসা আর কোন কথা বলতে সাহস পেল না । আসলে ও নিজে যতটা না আমার এই রূপ দেখে অবাক হচ্ছে আমি নিজেও তার থেকেও বেশি অবাক হচ্ছি । বারবার মনে হচ্ছে আমার নিজের ভেতরে এতো রাগ কোথায় ছিল ?
আমি বললাম
-কেন গিয়েছিলে ? বল কেন গিয়ে ছিলে ?
এরিসা আবারও চুপ করেই রইলো ।
-কি আমাকে দিয়ে হয় না ? একজন পুরুষে মন ভরে না ?
লাইন গুলোর ভেতরে এমন কিছু ছিল যে এরিসা আমার দিকে তাকিয়ে আবার নিজের দিকে তাকিয়ে ফেলল । ওর চেহারার দিকে তাকিয়েই মনে হল ও এমন কথা জীবনে আর কোন দিন শোনে নি । আমার রাগ তখনও কমে নি । বললাম
-কত দিন থেকে চলছে ? বল
এবার একটু ধমকে উঠলাম ।
-বল কদিন থেকে চলছে ?
আমার ধমক শুনে একটু যেন কেঁপে উঠলো । তারপর বলল
-মাস খানেক ধরে যোগাযোগ হচ্ছে । ও মেসেজ দেয় আমাকে । আমি প্রথমে গাঁ করি নি ।
-কেন শুনলে ওর কথা ? বল কেন শুনলে ? আমার তোমার প্রতি কোন অবহেলা করেছি ? কোন দিন করেছি ? তোমাকে সময় দেই নি । নাকি খুব বেশি এভেইলএবল হয়ে গেছি এই জন্য ?
এরিসা কোন কথা বলল না ।
-বল ? অন্য কোন মেয়ের দিকে ইন্টারেস্ট দেখিয়েছি কোন দিন ? তোমাকে ঘরের ভেতরে বন্দী করে রেখেছি ? স্বাধীনতা দেই নি ? কি করি নি বল আমাকে তুমি বল আমি কি করি ? নাকি তোমার জন্য রান্না করি বলে তোমার ব্যাপার টা পছন্দ না ।
অনেক টা সময় চুপ থাকার পর এরিসা বলল
-আসলে আজকে এমন ভাবে রিকোয়েস্ট করলো যে আমি মানা করতে পারি নি ।
-আচ্ছা । ভাল । খুব । এবার থেকে ওর হামবল রিকোয়েস্টে সাড়া দিও । ঠিক আছে । আমার কোন আপত্তি নাই । কিন্তু আমার বউ থাকা অবস্থায়, না । কালকেই তোমার লইয়ার কাজিন কে ডাক দিবা । তাকে বলবা তুমি কি করেছো । আর তারপর ঝামেলা মিটিয়ে ফেলবা । এমন বউ আমার ঘরে দরকার নাই । বিন্দু মাত্র দরকার নেই ।
আমি আর কোন কথা না বলে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিলাম । ওর সামনে থাকলে হয়তো আমি আমার নিজের রাগ কে নিয়ন্ত্রন করতে পারবো না । শেষে ঘটনা অন্য দিকে যাবে । পুরো ডাইনিং রুমে তখনও ভাঙ্গা কাঁচ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ।
শোবার ঘরে গেলাম না । নিজের স্টাডি রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম ।
ভেবেছিলাম রাতে হয়তো ঘুম আসবে না । কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম শোয়া মাত্রই আমার ঘুম চলে এল । সকালে ঘুম ভাঙ্গলো একটু বেলা করেই । আমি স্বাধারনত এতো সকাল পর্যন্ত ঘুমাই না । ম্যানেজার কে ফোন করে বলে দিলাম আজকে রেস্টুরেন্টে আসতে আমার একটু দেরি হবে । কাল রাতের কাঁচ দেখলাম আর পরে নেই । নিশ্চয়ই এরিসা পরিস্কার করে ফেলেছে । সকালের নাস্তার জন্য আলু কাটছি এমন সময় দেখহি এরিসা আমার পাশে এসে দাড়ালো ।
আমি খুব স্বাভাবিক ভাবে বললাম
-অফিস যাবে না ?
-না ।
-যাক ভাল । তোমার ঐ কাজিন কে খবর দাও ।
-অপু প্লিজ । আই এম সরি ।
-সরি হওয়ার তো কিছু নেই । তাই না । তুমার পছন্দ বদলাতেই পারে । আমার সাথে থাকতে তোমার ভাল নাই লাগতে পারে । তাই ।
ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম ও মুখটা কেমন অন্ধকার হয়ে গেছে । আসলে ও হয়তো ভেবেছিল যে রাতের ঘটনার পর সকাল বেলা আমি হয়তো ঠিক হয়ে যাবো । আগেকার ভাল স্বামী হয়ে যাবো যে কখনই ওর উপর রাগ করে না ।
আমি বললাম
-শুনো আমি জীবনে সব কিছু সহ্য করে নিবো কিন্তু আমার বউ অন্য কোন ছেলের সাথে টাংকি মেরে বেড়াবে এটা আমি সহ্য করবো না । এমন বউয়ের সাথে ঘর করার কোন ইচ্ছা আমার নেই । পরিস্কার হয়েছে ব্যাপার টা ?
-প্লিজ এইবারের মত ভুলে যাও । আমি তো কেবল দেখা করতে গিয়ে ছিলাম । আর কিছু না । বিশ্বাস কর ।
-কেন গিয়েছিলে ? কেন গিয়ে ছিলে ? তোমার ভাল বন্ধু সে ? বল বন্ধু । তোমার সব বন্ধুদের তো তুমি ঠিকই আমার রেস্টুরেন্টে নিয়ে এসেছো ? দেখাই যখন করবে তখন আমার রেস্টুরেন্টে কেন আনো নি ? অন্য খানে কেন গেলে ? তোমার মনে যদি সৎ সাহসই থাকবে তাহলে কেন আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দাও নি ।
এরিসা কোন কথা না বলে চুপ করে দাড়িয়ে রইলো মাথা নীচ করে । আমি আলু ভাসি টা কড়াই ছেড়ে দিলাম । এখন পরোটা ভাজা বাকি । তারপর বেশ কিছু কাজ করতে হবে । এরিসা বলল
-আমি চাকরী ছেড়ে দেব ।
-তোকে তো চাকরী ছাড়তে বলি নি আমি । বলেছি ? অনলি আই আস্ক টু বি লয়্যাল । নাথিং এলস ।
আমি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম তখনই কলিংবেল বেজে উঠলো । আমি এরিসা কে বললাম
-ভাজিটা একটু দেখো আমি দেখি দরজায় কে আসছে ?
দরজা খুলতে দেখি দুজন পুলিশ সেখানে দাড়িয়ে । আমার দিকে তাকিয়ে বলল
-মিস্টার অপু হাসান ?
-জি ।
-আপনার নামে আমাদের কাছে অভিযোগ আছে ।
-কিসের অভিযোগ ?
-আপনি গতকাল একজন কে বেদম পিটিয়েছেন ।
মুহর্তেই আমার মেজাজ টা আরও খারাপ হয়ে গেল । আমি বললাম
-সুযোগ পেলে হারামজাদাকে আমি আবারও পেটাবো । হাত পা ভেঙ্গে দেব ।
পুলিশ দুজন আমার দিকে অর্থ পূর্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল
-ভেতরে এসে কথা বলি আমরা ?
-আসুন ।
বসতে বসতে বলল
-আসলে অভিযোগ করলেও আমরা এখনও তার অভিযোগ নেই নি । আগে ব্যাপার টা খতিয়ে দেখতে এসেছি ।
আমি বললাম
-ঐ বদমাশ টা আমার ওয়াইফ কে মাস খানেক ধরে ডিস্টার্ব করছে । কয়েকবার মানা করা সত্ত্বেও শোনি । কাল কে পালিয়ে গিয়ে বেঁচে গেছে । নয়তো ওর হাত পে ভেঙ্গে দিতাম । এতো বড় সাহস ।
-দেখুন অভোযোগ কারী কিন্তু বেশ ভাল ঘরের ছেলে ।
-আপনার কি মনে হচ্ছে আমরা খারাপ ঘরের ছেলে ?
-না । তা বলি নি । আমি কেবল জানতে চাই আপনার ওয়াইফ কাল ওখানে গেল কেন ?
আমি কিছুতে যাব তার আগেই এরিসা পেছন থেকে বলল
-ঐ অভি বেশ কয়েকদিন থেকে আমার পেছনে লেগেছিল । আমি মানা করার সত্ত্বেও । কত বার নিষেধ করেছি কিন্তু শুনে নি । আমার কাছে ওকে পাঠানো মেসেজ গুলো সে কথা প্রমান করবে । কাজ গিয়ে ছিলাম ওকে সামনা সামনি মানা করতে । আমার হাসব্যন্ডকেও নিয়ে গিয়ে ছিলাম । কিন্তু এক সময় অভি আমার সাথে বেয়াদবী শুরু করে । আমার হাত ধরার চেষ্টা করে । এটা অপু দেখে আমাকে বাঁচাতে আসে । আপনার কি মনে হচ্ছে এটা সে অন্যায় করেছে ? নিজের স্ত্রীকে বখাটের হাত থেকে বাচানো নিশ্চয় অন্যায় না । আর যদি অন্যায় মনে করেন তাহলে ওকে ধরে নিয়ে যান । আমি এই টুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি যে থানা নিয়ে যাওয়ার আগেই আমি জামিন করিয়ে ফেলবো । তারপর আপনার অভিযোগকারীকে বলে দিবে অপুকে ছাড়িয়ে আনার পর আমি ওর নামে প্রথমে ইভটিজিং তারপর সেক্সুয়্যাল হ্যারাজমেন্ট এরপর এটেম্ট টু রেপের কেইস করবো । পরিস্কার হয়েছে ব্যাপার টা ?
আমি কি বলবো আমার সামনে বসা অফিসার দুজন এরিসার কথা শুনে থ হয়ে গেল । কোন মেয়ে এভাবে দঢ়তার সাথে কথা বলতে পারে তাদের মনে হয় ধারনার বাইরে ছিল । একজন উঠে দারিয়ে বলল
-আমরা কেবল এই জন্যই এসেছিলাম । থেঙ্কিউ ম্যান । আমরা আসি ।
ওরা চলে যাওয়ার পর আমার মনে হল চুলায় আলু ভাজি রেখে এসেছি । আমি সেদিকে গেলাম । আমার পেছন পেছনই এরিসা এল । আমি ভাজি নাড়তে নাড়তে বললাম
-সকালে আর কি খাবে ?
এরিসা বেশ আদুরে গলায় বলল
-চুম খাবো ।
তাকিয়ে দেখি এরিসা আমার দিকে অন্য চোখে তাকিয়ে আছে । এতোটা সময় যে রাগ টা ধরে রেখেছিলাম সেটা কেন জানি আর ধরে রাখা সম্ভব হল না । আমার মুখ দিয়ে একটু হাসি বের হতেই এরিসা যেন উড়ে এসে আমার কে জড়িোয়ে ধরলো ।
লিখা : অপু তানভীর

0 comments:

Post a Comment