ছুটির দিন।মুষল ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে।
এরকম একটা দিনে খিচুড়ি খাবার মজা
টাই আলাদা।সাথে যদি থাকে ভুনা গরুর
মাংস।
•
• আনিকার সাথে ইচ্ছে মত ঝগড়া করে
বাহিরে বেরিয়ে পড়লাম।
সবার কাছে ঝগড়ার কারণ সামান্য মনে
হলেও সেটা আমার কাছে মোটেই
সামান্য নয়।
কারণ এমনিতেই আমি খুব ঘুমপ্রিয়।আর এই ছুটির দিনে সাত সকালে ঘুম থেকে
উঠিয়ে বলে কিনা ডাল আনতে হবে।
•
•
ঘুম থেকে উঠছিলাম না দেখে আনিকা
আমার কানে কি যেন ঢুকিয়ে দেয়। মানে কি যেন বলে না...?ঐযে কাগজকে
মুড়িয়ে চিকন কাঠির মত করে বানায়...
আমি তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে বলি,
- কি হচ্ছে এসব?
- কি হচ্ছে বোঝো না?কখন থেকে ডাকছি?
- এই ফাজলামি পেয়েছো?ছুটির দিনে সাতসকালে ডাকাডাকি শুরু করেছো।তাও
আবার বৃষ্টির দিনে।
- বৃষ্টির জন্য ছাতা আছে না?ছাতা নিয়ে
বাহিরে যাও।
- মানে কি জন্য বাহিরে যাব এই বৃষ্টির
মধ্যে? - ডাল আনতে।
.
এ কথা শোনার সাথে সাথে বিছানায়
কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম।
সাথে সাথে সেও আমাকে জড়িয়ে ধরে
বুকের উপর শুয়ে পড়েছে। কি প্যারা রে বাবা...
শান্তিমত ঘুমোতেও দিবে না।
•
আমি বললাম,
- এই সরো সরো।
- সরব না। - যাচ্ছি তো।
সরে গিয়ে বলল তাড়াতাড়ি যাও।
আমি- যাচ্ছি যাচ্ছি।তোমার মত ভারি
মেয়েকে বুকে নেবার থেকে বাহিরে
যাওয়া ঢের ভালো।
আনিকা- কি বললে?আমি ভারি? আমি- হ্যা।তুমি একশ বার ভারি।(মুখ ধুতে
ধুতে বললাম)
এরপর ছাতা নিয়ে বাহিরে চলে গেলাম।
ডাল নিয়ে আধ-ভেজা হয়ে বাড়ি
ফিরলাম।
কিন্তু আনিকাকে দেখলাম না।ভাবলাম ওয়াশরুমে গেছে হয়ত।
তাই ডাল এর প্যাকেট টেবিলে রেখে
বিছানার দিকে এগিয়ে গেলাম আবার
ঘুমাব বলে।
কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলাম।
প্রায় আধাঘণ্টা পর কিছু একটার ঘ্রাণ আসলো।
খাবারের ঘ্রাণ।
উঠে টেবিলের কাছে গিয়ে দেখি সেই
খাবার গুলো।
এবার বুঝতে পারলাম এই বৃষ্টির দিনে
উঠিয়ে কেনো ডাল আনতে পাঠিয়েছিল। খাবারের লোভে আর আনিকার কথা মনে
ছিলো না।
চটপট খাওয়া শুরু করে দিলাম।কিন্তু ২
বার মুখে নেবার পর পর ই মনে হলো সব ই
ঠিক আছে কিন্তু কিছু একটা মিসিং।
তৎক্ষণাৎ মনে পড়ল আনিকার কথা। নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বললাম কি
করলাম এটা।
খাওয়া থেকে উঠে হাত ধুয়ে সারা ঘর
খোঁজার পর দেখি সে বারান্দায় বসে
আছে।
কাছে গিয়ে দেখলাম সে চোখ মুছছিলো। নিজেকে একটু অপরাধী মনে হলো।
•
•
আমি- কাঁদছো কেনো?
আনিকা- ........ (কোনো উত্তর দিলো না।)
. .
হাত ধরে সামনে ঘুরিয়েই কোলে তুলে
নিলাম।
আনিকা ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে
আর বলছে,
- ছাড়ো,ছাড়ো....পড়ে যাব তো!! - ছাড়ব না।এখন কোনো সন্দেহ আছে তুমি
যে ভারি না।
- ঢং করা লাগবে না ছাড়ো।
- বউ এর সাথে ঢং না করলে কি বাহিরের
মেয়েদের সাথে করব?
- করো যাও। আমার কি? - নাহ।এত সুন্দর বউ রেখে অন্য কারো
সাথে ঢং করতে পারি?
- অনেক হয়েছে।এবার খাবে চলো।
.
.
এভাবেই হাসি-ঝগড়ার মধ্যে ভালোবাসায় কেটে যাচ্ছিল আমাদের
দিন গুলো।
কিন্তু হঠাৎ-ই আমাদের পারিবারিক
জীবনে অন্ধকার নেমে আসে।
•
• আনিকা আর আমার এ্যারেঞ্জ ম্যারেজ।
প্রথম প্রথম তাকে মেনে নিতে কষ্ট
হলেও পরে আমাদের ভালোবাসার কমতি
ছিলো না।
আর তাকে মেনে নিতে কষ্টের প্রধান
কারণ ছিলো অর্পা। পরিস্থিতির শিকারে আমি আনিকাকে
বিয়ে করেছি।কিন্তু ৩ বছরের রিলেশন
ছিলো আমার আর অর্পার মধ্যে।এ কথা
অবশ্য আনিকা জানে।তবুও তার কোনো
আপত্তি ছিলো না।সে বলেছিলো এক সময়
সব ঠিক হয়ে যাবে। আনিকার মধ্যে এমন কিছু ছিলো যার
কারণে মন থেকেই ভালোবাসা আসত ওর
জন্য।আর অর্পার কথাও প্রায় ভুলেই
গেছিলাম।একেবারেই ভুলে যেতাম যদি
না সেদিন দেখা হত।
• •
এরপর বেশ কিছু দিন কেটে যায়...আবারো
দেখা হয় অর্পার সাথে।মানে সে-ই
দেখা করতে বলে আর কি।
আমি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায়
এসে দেখি অর্পা বসে আছে।আর আমিও তার প্রতি অনেকটাই দূর্বল ছিলাম।তা
না হলে বিয়ের পর কখনোই এভাবে দেখা
করতে আসতে পারতাম না।
.
.
আমি- বলো কেনো ডেকেছো? অর্পা- কেমন আছো?কেমন যাচ্ছে
তোমাদের দিন কাল?
আমি- ভালো।তোমার?
অর্পা- কান্নার স্বরে বলল,,,একটুও ভালো
না।
একটুও ভালো নেই আমি। আমি- কেনো?
অর্পা- তোমাকে ছেড়ে যাবার পর থেকে
ভেবেছিলাম অনেক ভালো থাকব।কিন্তু
পারি নি আমি।
আমি- এখন এসব ভেবে লাভ নেই।
আর্পা- আচ্ছা আমাকে বিয়ে করবে? আমি- তোমার কি মাথা খারাপ?তুমি
জানো না আমার বিয়ে হয়ে গেছে।
অর্পা- তুমি আমায় ভালোবাসো না?
আমি- বাসতাম।
অর্পা- আর এখন?
আমি- ........ .
.
আমি কিছু না বলে সেখান থেকে চলে
এলাম।
আমি জানি না এখনো তাকে ভালোবাসি
কি না।কিছুটা হলেও হয়ত বাসি। তারপর আরো কয়েকটা দিন কেটে যায়।
কিছুদিন ঠিকঠাক চলার পর আমার আর
আনিকার মাঝে কেনো জানি না
একপ্রকার দূরত্বের সৃষ্টি হয়।
সে আগের মত আমার কেয়ার করে না।
প্রায় প্রায় আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। কিন্তু আগে তো এমন ছিলো না।
তাহলে কি সে আমার আর অর্পার দেখা
করার বিষয় টা জেনে গেলো?
জিজ্ঞেস ও করা যাবে না...যদি না জেনে
থাকে...
একরকম দ্বিধা কাজ করছে। ভাবলাম কাল একবার অর্পাকে জিজ্ঞেস
করব...সে কিছু বলে নি তো!
কিন্তু রাতের খাবারের পর পর ই আনিকা
বলল,
- কাল অফিস থেকে ফেরার সময় যেন অমুক
রেস্টুরেন্টের সামনে অপেক্ষা করবে। একটা সারপ্রাইজ আছে।
- ঠিক আছে।
মনে মনে ভাবলাম কি এমন সারপ্রাইজ...
•
•
• যথারীতি অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে
সন্ধ্যা ৭ টা।
যেখানে অপেক্ষা করতে বলেছিলো
সেখানে এসেই দেখলাম অর্পা দাঁড়িয়ে।
আমি একটু অবাক হলাম।তার তো এখানে
থাকার কথা নয়।এখানে তো আনিকা আমায় ডেকেছিলো।
অর্পা আমায় দেখতে পেয়ে কাছে এসে
বলল..
- ও তুমি এসে গেছো??
- মানে?তোমায় কে ডেকেছে এখানে?
- কে আবার?তোমার স্ত্রী।আনিকা। .
এতক্ষণে দেখলাম আনিকার আগমন.......
.
.
আমি- কি ব্যাপার আনিকা?তুমি অর্পাকে
কেনো ডেকেছো? আনিকা- একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে
বলে...এজন্য।
খাম টা খুলে দেখি ডিভোর্স পেপার।
এটা দেখে তো আমার চোখ কপালে ওঠে।
আমি- এসবের মানে কি?
. হঠাৎ অর্পা বলে ওঠে...
আমি বলছি থামো...
.
সেদিন আমি তোমায় জিজ্ঞেস
করেছিলাম,এখনো ভালোবাসো কি না
আমায়।তুমি সেদিন উত্তর না দিয়ে চলে গেছিলে।আমি জানি তুমি এখনো আমায়
ভালোবাসো।আর তুমি চাইলেই আমাকে
বিয়ে করতে পারো।
আমি এই সব কথা গুলো আনিকাকে বুঝিয়ে
বলেছি।আমি তোমায় ছাড়া কিছুতেই
থাকতে পারব না।প্লিজ আমায় ফিরিয়ে দিও না।
আমি- তোমার মাথা ঠিক আছে তো?
.
আনকা আমার দিকে কলম টা এগিয়ে দিয়ে
সাইন করার জন্য অনুরোধ করল।
তার দিকে তাকিয়ে দেখলাম,,,,চাদের আলোয় চোখের পানি ছলছল করছে।করুণ
দৃষ্টিতে একভাবে চেয়ে রয়েছে আমার
দিকে।কিন্তু কিছু বলতে পারছে না।
আমি বুঝতে পারছি সে চাহনির ভাষা।
আর অপর দিকে অর্পা...
তার চোখের চাহনি বলছে যেন সাইন করে দেই।
আমার মাথায় কিছুই আসছিলো না...কাকে
গ্রহণ করব আর কাকে বর্জন করব কিছুই
বুঝভছিলাম না।সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে
ঠাশ করে একটা চড় লাগিয়ে দিলাম
অর্পার গালে। বললাম- বেয়াদব মেয়ে?আমাদের সংসার
ভাংতে এসেছো তাই না??আমি কি তোমার
খেলনাপুতুল? যখন যা ইচ্ছে হবে তাই
করাবে.?
.
. কথা টা বলেই আনিকার হাত থেকে কলম
টা নিয়ে ছুড়ে মাটিতে ফেলে দিলাম আর
সাথে কাগজ টাও টুকরো টুকরো করে ছিড়ে
ফেলে দিলাম।
এরপর আনিকার হাত ধরে হ্যাচকা টান
দিয়ে সেখান থেকে নিয়ে চলে এসে অনেকটা ধমক দিয়ে বললাম...
- এই বউ তুমি আমার??এই তোমার
সারপ্রাইজ?
এই ভালোবাসা তোমার আমার প্রতি?বউ
এর পরিচয় টা রাখলে তুমি??
. সে কিছু বলল না।শুধু আমার চোখের দিকে
তাকিয়ে এক ফোটা- দুই ফোটা করে জল
ফেলতে শুরু করল।
আমি একটা রিকশা ডেকে ওকে সাথে
নিয়ে উঠে পড়লাম।
• •
রিকশা চলছে...আমি বসেছি ডান পাশে।
আমার বাম কাঁধে মাথা রেখে বসেছে
আনিকা।
আর গালে চাঁদের আলো পড়ে তার
কাঁদোকাঁদো চেহারাটার মায়া যেন শতগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
.







0 comments:
Post a Comment