Monday, August 14, 2017

ভালবাসার কাঙ্গাল।।।

সম্পূর্ন বাস্তবতার সাথে
কিছুটা কল্পনার মিশ্রন।।।
আমি মানুষ! সত্যি কি মানুষ? নাকি মানুষ হওয়ার অভিনয় করছি???
আমার নাম! নামটা এখন আর বলতে ইচ্ছে করে না। তবুও মাঝে মাঝে জোর করে বলতে হয়। নামটা না বলতে চাওয়ার যথেষ্ট কারনও আছে। সত্যি বলতে যারা আমার নামটা রেখেছিল আর ডেকেছিল তারা সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। যাই হউক তারপরেও বলি। আমার নাম সুমাইয়া আফরিন (নীলা)।
বাবা মায়ের খুব আদরের ছিলাম আমি। দুই ভাই, আমি আর বাবা মা নিয়ে ছিল আমাদের পরিবার। দুই ভাই আমার বড় তারপরে আমি। বাবার মেয়ে খুব পছন্দ ছিল। আর আমি ছিলাম বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। তাই আদর, ভালবাসা একটু বেশিই পেতাম।
এইরকম করে খুব সুখেই কাটছিল আমার দিনগুলো। কিন্তু কথায় আছে না ' ইদুরের কপালে শিদুর লাগে না'। আমার বয়স যখন ১৫ বছর তখন হঠাৎ করে বাবা মারা যান। বাবা আমার আর আমি বাবার সবচেয়ে প্রিয় ছিলাম। তাই বাবা মারা যাওয়ার পরে আমি সম্পূর্ন নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম। অনেকটা ভারসাম্যহীন হয়ে গিয়েছিলাম।
সবকিছু সামলে উঠতে প্রায় ৬ মাস গেছেছিল। সবকিছু মাত্র ঠিক হয়ে আসছিল। ঠিক তখনি বাবার মৃত্যুর ৭ মাসের মাথায় হঠাৎ করে মা মারা গেল। আমাকে একা করে চলে গেল বাবার কাছে। কথায় আছে না ' কষ্টকে আমি যতই দূরে সরাই, কষ্ট আমাকে ততই আকরে ধরে। পুরো পৃথিবীটা আমার অন্ধকার হয়ে গেল। সুন্দর সাজানো সংসারটা এলোমেলো হয়ে গেল। এই পৃথিবীতে একদম একা হয়ে গেলাম। অনেকটা পাগল প্রায় হয়ে গিয়েছিলাম। নিজেকে সামলে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম।
আমার একমাত্র মামা ছিল। তিনি এসে আমাকে নিয়ে গেলেন তার কাছে। কারন, ভাইরা সবাই কাজের জন্য অন্য জায়গায় থাকে। চলে গেলাম মামার বাড়ি। শুরু হলো আরেকটা জীবন। খুব যে খারাপ ছিলাম তা কিন্তু না আবার "ভাল" ও যে ছিলাম তাও না। মামাতো আদর করতো অনেক। আর মামি, মামাতো ভাই,বোনরা ও আদর করতো। তবে " কাজের আদর"। কাজ ঠিকমতো করতে পারলে খুব ভাল। আর না পারলে? থাক তা আর বললাম না। আমি বাড়ির প্রায় সব কাজই করতাম আমি। লেখাপড়াতো থেমেছে সেই বাবা মারা যাওয়ার পরেই। মামার বাসায় আসার পরে সেলাইয়ের কাজটা শিখেছিলাম। এইরকম করে চলছিল আমার দিনগুলো। চলতে চলতে প্রায় ৬ বছর কেটে গেল।
হঠাৎ একদিন মামাতো বোনের কাছে শুনলাম মামা নাকি আমির বিয়ে ঠিক করেছে। কিন্তু আমি এর কিছুই জানি না। সত্যি বলতে আমার জানার কথাও না। বিয়ে দিচ্ছে এইতো অনেক বেশি। দীর্ঘ দিনতো তাদের অন্নধ্বংস করলাম। আর কত? দেখতে দেখতে বিয়েটা হয়ে গেল। আমার কার সাথে বিয়ে হলো, কোথায় বিয়ে হলো তার কিছুই আমি জানি না।
শুরু হলো স্বামীর সংসার অথ্যাৎ শশুড় বাড়ির জীবন। এখানে এসে আমার পুরো পৃথিবীটা বদলে গেল। শশুড়, শাশুড়ি,নদন,দেবর সবাই আমাকে খুব আপন করে নিল। সবাই আমাকে খুব ভালবাসতো। আর সবথেকে বেশি যে মানুষটা আমাকে ভালবাসতো সে হলো আমার স্বামী। বলা চলে পাগলের মতো ভালবাসতো আমায়। আমার কি চাই, কখন কি প্রয়োজন, সবকিছু নিমেশেই বুঝে নিত। আমি মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যেতাম। কখনো যদি বাবা-মায়ের কথা মনে করে মন খারাপ থাকতো। তাহলে "ও" খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিতো। আমি ওরে বুঝাতাম কিন্তু, "ও" বুঝতে নারাজ। বলতো আমি যতদিন ওর কাছে আছি ততদিন কোন সময়ই মন খারাপ করতে পারবো না। আর একটা কথা বলতো যে, যখন "ও" আমার কাছে থাকবে না তখন যেন যত পারি মন খারাপ করি। আমি ওরে আর কিছুই বলতে পারতাম না। শুধু জড়িয়ে ধরে কাদতাম। আর চিন্তা করতাম ওর মতো একটা মানুষ কিভাবে আমার মতো এতিমকে এতো ভালবাসতে পারে?
এইরকম করে চলছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের দিন গুলো। কিন্তু না! আগেই বলেছিলাম সবার কপালে সুখ শয় না। একদিন সকালে "ও" বাসা থেকে বের হচ্ছিল আর বলছিল দুপুরে এসে একসাথে খাবে। "না" ও আর আসলো "না"। এসেছিল ওর ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত লাশটা। বাসা থেকে যাওয়ার পথেই ওর এক্সিডেন্ট হয়। আর সেখানেই...........................। ওর লাশটা কখন এনেছিল, কখন কবর দিয়েছিল এর কিছুই আমি বলতে পারবো না। "ওরে" শেষ বারের মতো দেখার ভাগ্যটাও আমার হয়নি। কারন, ওর মৃত্যুর খবর পাওয়ার সাথে সাথেই আমি জ্ঞানশূন্য হয়ে যাই। আমার জ্ঞান ফিরেছিল ৩ দিন পরে। যখন চোখ খুলেছিলাম আমি সবকিছু অন্ধকার দেখছিলাম। মনে হচ্ছিল বুকের মধ্যে অনেক ভারি কিছু দিয়ে রাখা হয়েছে। আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হয়নি। শুধু দুচোখের পানিতে মাথার বালিশটা ভিজেছে। তখন আমি ঠিক "সেই আমি" যেমনটা বাবার মৃত্যুর পর হয়েছিলাম। " নির্বাক শ্রোতা"। ওর একটা কথা আমার কানে বাজতেছিল ( তুমি যতপারো মন খারাপ করো, যখন আমি খাকবো না)। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস আজ সত্যিই "ও" নেই। আর কোন দিন আসবে না। বলবে না, তুমি মন খারাপ করে রাখতে পারবে পারবে না। আমার পুরো পৃথিবীটা ঝীম কালো অন্ধকারে ঢেকে গেল।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো। কিন্তু না আগেইতো বলেছি সম্পূর্ন বাস্তবতার সাথে কিছুটা কল্পনার মিশ্রন আছে। তাই কিছুটা তফাৎ তো থাকবেই।
আমার স্বামী মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ পরে আমার দুই ভাই আমাকে তাদের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বললো। আমি কিছুতেই রাজি হচ্ছিলাম না। চিন্তা করলাম এখানে থেকে ওর স্রৃতি টুকু আকরে ধরে বেচে থাকবো। কিন্তু দুই ভাই আর আমার শশুড় শাশুড়ির অনুরোধে চলে আসলাম। ভাইদের কাছে অথ্যাৎ আমার বাবার বাড়ি এসেছি ঠিকই কিন্তু, আমার সবকিছু মন প্রাণ সবকিছুই ওর বাড়িতে রেখে এসেছি। শুধু আমার জীবিতমুদ্দার মতো দেহটা আছে এখানে। শান্তি -অশান্তি, ইচ্ছেবিহীন হাসি, অন্তবিহীন কান্নার মধ্য দিয়ে চলে গেল ১ বছর।
একদিন আমার বড় ভাই এসে আমাকে বলল, তারা আমাকে আমার বিয়ে দিতে চায়। কথাটা শোনার পরে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরলো। কোন ভাবেই আমি রাজি হচ্ছিলাম না। ভাইরা অনেক ভাবে বুঝালেন। আমি কিছুই বুঝতেছিলাম না। কি করবো? কি করা যায়?
অবশেষে সবদিক চিন্তা করে রাজি হয়ে গেলাম। কতদিন আর ভাইদের সংসারে থাকবো। তাদের ও নিজের সংসার আছে।
শুনলাম যার সাথে আমার বিয়ে হচ্ছে তার নাকি ২ (দুই) টা মেয়ে আছে। দেখতে দেখতে একমাস পরে বিয়েটাও হয়ে গেল। চলে গেলাম আরেকটা জীবনে। শুরু হলো আরেকটা জীবনের সাথে পথ চলা। শুরু হলো নতুন এক সংসার। আমার নতুন স্বামীর আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। কোন রকমে খেয়ে-দেয়ে চলে আরকি। আগে নাকি ভাল অবস্থা ছিল। কিন্তু তার আগের স্ত্রী ক্যান্সারের চিকিৎসায় সব শেষ হয়ে গেছে।
নতুন সংসার! খুব একটা কষ্টের মধ্যেই শুরু হলো। সংসারের হাল ধরতে আমি সেলাইয়ের কাজ শুরু করলাম। কিছুটা হলেও সাহায্য করার চেষ্টা করতাম। এই রকম করে টানা-পোড়ার মধ্য দিয়ে চলছিল আমার "নতুন সংসার"।
কিছুদিন পরে লক্ষ্য করলাম আমার স্বামীর মেয়ে দুটো আমাকে মেনে নিতে পারেনি। আমার নিজের কোন সন্তান ছিল না। তাই আমি ওদের নিজ সন্তানের মতোই ভালবাসতাম। নিজের মেয়ের মতো দেখতাম। আমার দিক থেকে ভালবাসার কোন কমতি দিতাম না ওদের। কিন্তু তারপরেও ওরা আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ করতো ওদের বাবা অথ্যাৎ আমার "নতুন স্বামী" এর কাছে। আর আমার উপর চলতো "অত্যাচার"। আমি তাদের নানা রকম ভাবে বুঝাতে চাইতাম। কিন্তু তারা কখনোই বুঝতো না, বা "আজো" বুঝে নাই।
আমার "নতুন স্বামী" ও আমাকে কখনো বুঝতে চায়নি আর "আজো" চায় না। আমি তাদের ঠিক যতটুকু "ভালবাসা দিয়েছি, তারা আমাকে ঠিক ততটুকু বা তার চেয়েও বেশি "কষ্ট" ফেরত দিয়েছে।
এই সংসারে আজ "১০" বছর হয়ে গেছে। এখন আমার নিজের ও ২ (দুই) টা মেয়ে আছে। সবকিছু মিলিয়ে সবার দোয়ায় "ভালই" আছি। শুধু অপেক্ষা আছি কবে "বড় মেয়ে" দুটোর ভালবাসা পাবো? জানিনা এ জীবনে পাবো কিনা?! কারন আমিতো "ভালবাসার কাঙ্গাল"!!!
হয়তো যখন পাবো, তখন আমি হারিয়ে যাবো এই অজানা পৃথিবীর "অন্তরালে"।।
.............................................. বিশুদ্ধ পাগল( শোভন সরকার)।।।

0 comments:

Post a Comment