Sunday, September 17, 2017

ভালোবাসা জেগে রবে সেই অন্ধকার রাতে।

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও অনুপমা আজ বাইরে
যায় নি। আজ সারাদিন ঘরে বসে বসে কাটিয়ে
দিলো। অনুপমাকে ছোট করে অনু বলে ডাকে
সবাই। একমাত্র তার বাবাই তাকে অনুপমা বলে ডাকে।
দুপুরে যখন সবাই ঘুমিয়ে যায় তখন জালাল সাহেব
চেঁচিয়ে অনুপমাকে ডাকে। আজও জালাল সাহেব
তার ব্যতিক্রম করে নি। দুপুরে জালাল সাহেব
অনুপমাকে গলা উঁচিয়ে ডাকলো, অনুপমা, অনুপমা। কই
রে মা???
-আসছি বাবা। (অনুপমা শান্ত গলায় জবাব দেয়)
জালাল সাহেব চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা
লাগিয়ে লাইব্রেরী ঘরে বইয়ের পাতায় মুখ গুজে
বসে থাকে। মাঝে মাঝে গড়গড় শব্দ করে হাসে।
কখনও কখনও আবার চশমাটা চোখ থেকে নামিয়ে
সেটা লুঙ্গি দিয়ে মুছে নেই। অনুপমা জালাল
সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে,
কি বাবা?
-আমাকে এক মগ কফি বানিয়ে দিতে পারবি মা?
-পারবো বাবা? (কথাটি বলেই দাঁড়িয়ে থাকে অনুপমা।)
জালাল সাহেব বই থেকে মুখ না সরিয়েই বলে
উঠে, কি রে মা, কিছু বলবি বাবাকে?
-না বাবা।
কথাটি বলেই অনুপমা চলে যায় কফি বানাতে। কিছুক্ষণ
পর দুই মগ কফি নিয়ে জালাল সাহেবের সামনে
রেখে দেয়। জালাল সাহেব বইয়ের পৃষ্ঠায় মুখ
গুজে বলতে থাকে, কি রে মা, কফি না খেয়ে
বসে আছিস কেনো?
-বাবা তুমি আগে নাও। তারপর আমি নেবো।
.
জালাল সাহেব বই থেকে চোখ নামিয়ে চোখ
থেকে চশমা খুলতে খুলতে বলে, আজ আমার
অনুপমার মনটা কি খারাপ নাকি?
-না।
-আমি কিন্তু কফি তে চুমুক দিয়ে ফেলেছি। তুই
এখনও নিস নি।
-নিচ্ছি বাবা। (কফির মগ হাতে তুলে নিতে নিতে
অনুপমা বলে উঠে।)
-আমার অনুপমার মনে কি কোনো খারাপ বায়ু প্রবাহিত
হচ্ছে? (সিগারেট জ্বালাতে জ্বালাতে বলে
উঠলো জালাল সাহেব।)
-না। তবে এখন বইবে। তোমার সিগারেটের
ধোয়ায় আমি এখন দূষিত হবো।
-দুঃখিত মা। (সিগারেটের জলন্ত মাথাটি এস্ট্রেতে
নিভিয়ে দেয় জালাল সাহেব।)
-বাবা কফি খেতে কেমন হয়েছে?
-খুব ভালো হয়েছে। আচ্ছা সবাই দুপুরে ঘুমিয়ে
যায়। কিন্তু তুই ঘুমাস না কেনো মা?
-আমি ঘুমালে তোমায় কফি বানিয়ে দেবে কে?
-বাবাকে বড্ড ভালোবাসিস। তাই না রে মা?
-হুম।
.
জালাল সাহেব বেশি কথা বাড়ায় না। চোখের চশমা
টাইট করতে করতে আবার বইয়ের পাতায় মুখ গুজে
দেয়। অনুপমা নিরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে জালাল
সাহেব কে দেখতে থাকে। জগতের এই একটি
মানুষকেই সে শুধু এত ভালোবাসে। আর
একজনকেউ ভালোবাসে। তবে বাবার চেয়ে
বোধ হয় কম ভালোবাসে। জগতের এই যে সব
ভালোবাসা ভালোবাসা খেলা তার কোনো অর্থ
নেই। সবই মোহ। স্বার্থের টানে তৈরি হয়।
একমাত্র মা-বাবার ভালোবাসায় কোনো স্বার্থ
নেই। কোনো লোভ বা লালসার জন্ম হয় না।
অনুপমার মা মারা গেছে তার জন্মের তিন বছর পর।
তার এক বছরের মাথাতেই ঘরে নতুন এক মায়ের
আগমন ঘটেছিলো। সে এখনও টিকে আছে।
প্রথম প্রথম অনুপমার নতুন মা তাকে খুব
ভালোবাসতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যে
প্রতিটি মানুষই পরিবর্তনশীল তা বুঝতে বাঁকি নেই
অনুপমার। সেভাবে অত্যাচার কখনই করে নি। কিন্তু
মায়ের ভালোবাসার যে অভাব অনুপমার ভেতরে
রয়েছে তার বিন্দুমাত্রও পূরণ করে নি অনুপমার নতুন
মা। মা বেঁচে থাকলে হয়তো আজ অনুপমার
চুলগুলো সিঁথি করে বেনি বেঁধে দিতো। কিংবা
অনুপমাকে নিয়ে তার স্বপ্ন আকাঙ্কা সর্বোচ্চ
পর্যায়ের হতো। আজ অনুপমা ইউনিভার্সিটিতে
পড়ছে। মা বেঁচে থাকলে হয়তো গর্ব করে
বলতো, আমার অনুটা কি কম জানে নাকি। আমার
মেয়ে হাজার হাজার স্টুডেন্টের ভীড়ে ৫ম স্থান
পেয়েছে। তাও কি এই সেই সাবজেক্ট নাকি?
বায়ো কেমিস্ট্রিতে সে চান্স পেয়েছে। অনু
একদিন বড় হবে। আমার মুখ উজ্জ্বল করলে ও-ই
করবে।
কিন্তু এসব কেউ বলে না। কেনো কেউ বলবে
এসব?এসব বলে তো কারো স্বার্থ সিদ্ধি হবে
না। আর নিঃস্বার্থ কোনো কিছুতেই মানুষের
তেমন আগ্রহ থাকে না।
.
জালাল সাহেব হঠাৎ করে বই রেখে দিলেন।
চোখ থেকে চশমা নামিয়ে নিয়ে অবাক চোখে
অনুপমার দিকে তাকালেন। অনুপমা তার দিকে তাকিয়ে
বলে উঠলো, কি দেখো বাবা?
-আমার মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই
দেখছি।
-বাবার কাছে ছেলে-মেয়ে কি কখনও বড় হয়?
-কখনও কখনও বড় হয়। ছেলে মেয়ে যখন বাবা-
মায়ের কাছে দুঃখ কষ্ট গোপন করে তখন মনে
হয় ছেলে-মেয়ে বুঝি অনেক বড় হয়ে
গেছে।
-বাবা তুমি বলতে চাইছো যে তোমার কাছ থেকে
আমি দুঃখ-কষ্ট গোপন করছি?
-মনের ভেতরে কষ্ট যখন বেশি হয়ে যায় তখনই
তা দুই মাধ্যম দিয়ে বাইরে বেড়িয়ে আসতে চাই।
চোখ আর মুখ দিয়ে। একেক জন একেক মাধ্যম
ব্যবহার করে। বেশির ভাগ মানুষ মুখ দিয়ে বের
করে দেয়। আর চাপা স্বভাবের মানুষ গুলো
চোখ ব্যবহার করে। পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী
মানুষগুলো এরাই। কারণ এদের কষ্ট গুলো বলার
শোনার মতো কেউ নেই বলেই মুখ দিয়ে
বের করতে পারে না। আর হতভাগ্য পিতা সেই যে
নিজ চোখে সন্তানের এই কষ্ট বের হওয়া নিজ
চোখে উপভোগ করে।
অনুপমা হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে এক গাল হাসি
দিলো। তারপর জালাল সাহেবের পাশে গিয়ে
বসতে বসতে বললো, বাবা তুমি খুব জ্ঞানী হয়ে
যাচ্ছো।
-তোর বাবা তো বরাবরই জ্ঞানী। সেই সময়কার
ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ফাস্ট ডিবিশন নিয়ে পাশ করা
ছাত্র বলে কথা। হাহাহাহাহা।
-হিহিহিহিহি। বাবা তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা বাবা।
-এটা ভুল ধারণা মা। সেরা বাবার প্রতিযোগিতা হলে
তোর বাবা অডিশন রুম থেকেই বাদ হয়ে যাবে।
-জ্বি না। তুমি বেশি জানো তো। বই পড়ছিলে পড়।
আমি আরেক মগ কফি তোমাকে বানিয়ে এনে
দিচ্ছি।
-ঠিক আছে।
অনুপমা জালাল সাহেবের পাশ থেকে উঠে পরে।
কফির মগ হাতে নিয়ে কিচেনে ঢুকে পরে
আরেক মগ কফি বানানোর জন্য।
.
অনুপমা জালাল সাহেব কে আবার কফির মগ ভর্তি
করে কফি বানিয়ে দিয়ে নিজের রুমে চলে
আসলো। একদম পূবের বেলকুণিসহ ঘরটায়
অনুপমার। অনুপমা এসে বেলকুণিতে গিয়ে
দাঁড়ালো। দুপুর নুয়ে পড়েছে বিকেলের
কোলে। সূর্যের তেজ কমে এসেছে। নরম
আলোর বিছানা পেতে দিয়েছে অপার
সৌন্দর্যময়ী এ প্রকৃতির ওপর। কিন্তু এসব কিছুই
অনুপমার মনে ধরছে না। কোথায় যেনো তার মন
বারবার কষ্টের সমুদ্র তলে ডুবে যাচ্ছে। এত
রূপময়ী সৌন্দর্য যখন কারো মন ভালো করতে
পারে না তখন অনুমান করে নিতে হবে তার
কষ্টের পরিমাণ কত। সূর্যের নরম আলো অনুপমার
গালে এসে পড়তেই তার ফোন বেজে
উঠলো। কিন্তু অনুপমার ইচ্ছে করছে না সেই
ফোন ধরতে। মাত্রই বিকেলের এমন দৃশ্যটা তার
ভালো লাগতে শুরু করেছে। সূর্যের আলোয়
মানুষ অনিচ্ছায় স্নান করে। কিন্তু অনুপমা ইচ্ছাকৃত
ভাবে এ আলো গায়ে মাখছে। অতি ফর্সা প্রকৃতির
এ মেয়েটি যেনো স্বর্গের অপ্সরী।
সৃষ্টিকর্তা তাকে যেনো গভীর যত্ন সহকারে
সৃষ্টি করেছেন। পড়ন্ত বিকেলে নব যৌবনপ্রাপ্ত
সেই অপরূপা তরুণী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির
সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে চাইছে।
.
অনুপমা অনিচ্ছা স্বত্তেও ফোনটা রিসিভ করলো।।
-হ্যাঁ বলো। (অনুপমা)
-কতবার ফোন দিয়েছি তোমায়? ( অনিক)
-কেনো দিচ্ছো বারবার ফোন?
-কেনো দিচ্ছি তা কি জানো না?
-তোমাকে বলেছি তো ফোন না দিতে।
-সামান্য একটা ভুলের জন্য তুমি এতদিনের সম্পর্ক
শেষ করে দিবা?
-আমি মেনে নিয়েছি সত্যটাকে।
-কিন্তু এ যন্ত্রণা আমি মানতে পারছি না।
-সেটা তোমার ব্যর্থতা অনিক।
-আমি তোমার বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছি।
-অনিক। পাগল নাকি তুমি?
-হ্যাঁ তোমার জন্য পাগল। একবার তুমি তোমার
বেলকুণিতে এসো প্লিজ।
অনুপমা ফোন নিয়ে বেলকুণিতে গিয়ে দাঁড়ালো।
অনিক নামের ছেলেটা কয়েকটা রঙ-বেরঙের
বেলুন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
-এসব পাগলামী কেনো করছো? (অনুপমা
আবেগী কন্ঠস্বরে বললো।
-শুধু তোমার জন্য।
-আমার জন্য কেনো?
-আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি জন্য।
-কিন্তু!!!!
-প্লিজ,,,কোনো কিন্তু নয়।
-হাতের বেলুন গুলো কি করবে?
-তুমি একবার ভালোবাসি বললে এগুলো আকাশে
উড়িয়ে দেবো। ভালোবাসার ঠিকানায়।
-যদি না বলি?
-মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো সারাজীবন এখানেই।
.
অনুপমার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ে পড়ছে।
আনন্দ অশ্রু। মুখে হাসির চমক কিন্তু চোখে
অশ্রু। এ এক বিষ্ময়কর দৃশ্য। অনিক নামের
ছেলেটি বেলুন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ছেলেটি দেখতে শুনতে হ্যান্ডসাম বলাই বাহুল্য।
পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি লম্বায়। মাথা ভর্তি চুলগুলো এক পাশ
করে আঁচড়ানো। মুখ ভর্তি দাঁড়ি-গোঁফ তবে
ছাটানো। ফর্সা গায়ের রঙ। তার মাঝে নীল রঙের
পাঞ্জাবী আর কালো রঙের জিন্সের প্যান্ট।
পায়ে চটিমত স্যান্ডেল। রাজপুত্র রাজপুত্র ভাব
স্পষ্ট। অনিক দাঁড়িয়ে আছে রঙিন বেলুন হাতে
নিয়ে। অপেক্ষা করছে অনুপমার কাছ থেকে
ভালোবাসার জবাব পাওয়ার জন্য।
.
অনুপমা যে অনিক কে ভালোবাসে না তা নয়। সামান্য
কিছু একটা নিয়ে ওদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি
হয়েছে। একে অপরকে ভালোবাসে দুজন
অনেক আগে থেকেই। অনুপমার সঙ্গত কারণেই
এই অনিক নামের ছেলেটির জন্যই মন খারাপ
ছিলো। যে মন খারাপের ব্যাপারটা অনুপমা জালাল
সাহেবকে বলতে পারে নি। এখন আর অনুপমার মন
খারাপ নেই। অনিক নামের পাগল এই ছেলেটি তার
মন খারাপের অবসান ঘটিয়েছে। অনুপমা কাঁদো
কাঁদো স্বরে অনিক কে বললো, ভালোবাসি পাগল
তোকে। অনেক অনেক ভালোবাসি। বুঝিস না তুই?
-আই লাভ ইউ মহারাণী। আমিও তোমাকে অনেক
অনেক অনেক ভালোবাসি।
.
আনন্দে উল্লাসিত হয়ে অনিক তার হাতের বেলুন
গুলো আকাশে উড়িয়ে দিলো। অনুপমা
বেলকুণিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাগল সেই
ছেলেটির পাগলামী উপভোগ করছে। অনুপমার
ঠোঁটে বিস্তৃত হাসির বন্যা নেমেছে। চোখে
চিকচিক করছে আনন্দ অশ্রু। প্রকৃতি এখন আস্তে
আস্তে অন্ধকারের কোলে ঢোলে পড়ছে।
সেই অন্ধকারের নিজস্ব এক অপরূপ বৈশিষ্ট্য
আছে। আছে লাবণ্যময়ী চাঁদের জোৎস্না।
আছে নিজেকে একাকীত্ব অনুভব করে প্রিয়
মানুষের কাছে সমার্পন করার সুসময়। ভালোবাসা
জেগে রবে সেই অন্ধকার রাতে। আর প্রতিটি
ভালোবাসা জুড়ে পড়বে নরম চাঁদের আলোর
চাদড়। অপ্রকাশিত সমস্ত ভালোবাসার মানুষ গুলো
সেই রাতেই তাঁদের ভালোবাসা প্রকাশ করে
তীব্র বাসনা মেটাবে।
.
# লেখকের_কথা
বেশ কয়েকদি যাবৎ লেখালেখি থেকে আমি
অনুপস্থিত। মনটা আনচান করছিলো খুব। গল্প লেখা
মানুষগুলোর দুই এক লাইনের লেখাতে তৃপ্তি
মেটে না। বস্তা পঁচা লেখা হলেও তা যদি দীর্ঘ হয়
তবেই একটা শান্তি অনুভব হয়। আমি লিখি মনের
আনন্দের জন্য। মূলত আমার জন্যই লিখি। তবুও যে
সমস্ত পাঠক আমার লেখাকে ভালোবাসে তাঁদের
জন্যও কাজ করতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে
মিশে যেতে তাঁদের সাথে। কিন্তু সব ইচ্ছেই
পূরণীয় নয়। আমি অসাধারন কেউ নয়। নিতান্তই সাধারণ
একজন মানুষ। হয়তো সকলের সাথে সেভাবে
আলাপ করতে পারি না বলে আমি যে বড় কিছু তা ভাবার
কোনো কারণ নেই। আমি আমাকে পাঠকের
চেয়ে নিচের স্তরের মানুষ বলেই মনে করি।
.Comment plz.


0 comments:

Post a Comment