[বিঃদ্রঃ এটি একটি অবান্তর ভৌতিক প্রেমের গল্প। যারা অবান্তর গল্প পছন্দ করেন না তারা পড়বেন না।]
..
ভালবাসায় লুকোচুরি না থাকলে বন্ধন আলগা হতে থাকে। তরী আমার সম্পর্কে সবই জানতো বলেই সে আমার ভালবাসাকে এড়িয়ে গেছে।
.
"নীল, এভাবে ভালবাসা হয় না.. এটা তো বোঝা উচিত আমি তোমার থেকে বয়সে বড়।"
.
হুম... এটাও একটা ফ্যাক্টর ছিল। বয়সে বড় হবার সুবাদে আমাকে সে বইয়ের মত
পড়ে ফেলতে পারতো। অর্থাৎ আমাদের সম্পর্কে 'হাইড' অপশন বা লুকোচুরি ছিল না।
যার প্রেক্ষিতে আমার অনুভূতি বুঝে নিতে তার তেমন বেগ পেতে হয়নি। পাঁচ বছরের
ব্যবধানের দেয়াল ভালবাসার মত পবিত্র শক্তিকেও অবমাননা করার ক্ষমতা রাখে..
কী অদ্ভূত, তাই না?
.
প্লেনে বসে এ সমস্তই কেবল ভাবছি আমি। অফিসের
একটা প্রজেক্টের কাজে আমেরিকার নর্থ ডাকোটায় রওনা হয়েছি। পাশেই আমার
ট্রেইনার অপরাজিতা বসে আছে। জানালার পাশে বসে আমি বাইরে তাকিয়ে আছি। প্লেন
আপাতত ত্রিশ হাজার ফুট উচ্চতায় আকাশ দাবিয়ে বেড়াচ্ছে। অপরাজিতা ম্যাডাম
আমাকে বললেন, "নীল, তুমি কি আমায় ফেসবুকে খুঁজে পাও না?"
.
জবাবের আশা না করেই পাল্টা বলে ফেলেন, "আমাদের মাঝে ২৫০ মিউচুয়াল ফ্রেন্ডস আছে, খেয়াল করেছো?"
.
"ম্যাডাম, আমি দুঃখিত.. ফেসবুকে বিশেষ সময় দেয়া হয় না আমার। যতটুকু ফেসবুকিং করি নীড থেকে করি। আপনাকে তাই চোখে পড়েনি।"
.
"হুম.. আর কখনও যাতে চোখে না পড়ে সেই ব্যবস্থাও করছি।"
.
ব্যাপার কী লক্ষ্য করতেই আমার মুখটা তেতো হয়ে গেল। ম্যাডাম তার মুঠোফোন
বার করে আমার আইডিটা মার্ক জুকারবার্গের নরকে পাঠালেন। আই মীন ব্লক করে
দিলেন। ঠিক এভাবেই ব্লকলিস্টে পাঠিয়েছিলাম একবার অনুরাধাকে। সেটাও তরীর
ঘটনার মত সুদূর অতীতের পাতায় লিপিবদ্ধ। তখন আমি অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।
ফেসবুকে সিলেটবাসী অনুরাধার সাথে পরিচয়। সিলেটিরা মানুষ হিসেবে খুব ভাল হয়
শুনেছি, অনুরাধাও ছিল তার চাক্ষুষ প্রমাণ।
.
"হ্যালো অনুরাধা?"
.
"আপনি কি বাংলায় টেক্সট করতে পারেন না?"
(তখন আমি ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহার করে বাংলা লিখতাম।)
.
"অনেক চেষ্টা করেও বাংলা লিখতে পারি না।"
.
"প্রেমে পড়েন। প্রেমিকা যখন বাংলা লিখতে বলবে তখন পারবেন।"
.
"সরি, আমি খুবই ব্যস্ত মানুষ.. প্রেমে পড়বার সময় নেই।"
.
"আচ্ছা? তা কী করেন আপনি?"
.
"আপাতত এমএসসি কমপ্লিট করে জব খুঁজছি।"
.
"জব খোঁজা তো খুবই ভাল আংকেল।"
.
"আরে.. বলামাত্রই বিশ্বাস করে নিলেন? আমি তো অনার্সে পড়ি।"
.
"কষ্ট করে আর খোকা সাজতে হবে না আংকেল।"
.
"হুম.. কথায় লজিক আছে। অবিশ্বাসীদের সত্যটা বোঝাতে গেলে জীবনটা কঠিনই হয়ে যায়।"
.
"বেশ ভাল কথা বলেন আপনি।"
.
এরকম মেয়েকে ব্লক মারার জন্য শক্তপোক্ত কারণ লাগে। সেটা আমি পেয়েছিলাম
অনুরাধার রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস থেকে। আমি যে তরীর পরে দ্বিতীয়বারের মত কারও
প্রেমে পড়েছি সেটা বুঝলাম এই স্ট্যাটাস দেখে।
.
"ভালবাসাটা
চিরঞ্জীব.. একথা পাগলেরাই বিশ্বাস করে। আজ থেকে আমাকে তুমি পাগল হিসেবেই
চিনে রেখো। তোমার প্রতি সীমাহীন ভালবাসা রইলো। ভাল থেকো।"
.
তারপর
থেকে আমার ফেসবুক প্রোফাইলে অনুরাধার আর বিচরণ রইলো না। তবে ভীষণ জানতে
ইচ্ছে করে আমার শেষ ম্যাসেজটি পেয়ে তার মাঝে কীরকম মনোভাব জাগ্রত হয়েছিল।
.
'..অ্যান্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ,
..অ্যান্ড মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ'
.
প্রজেক্টের আংশিক কাজ সেরে গাড়িতে চড়ে হোটেলে ফিরছিলাম। চোখে ভয়াবহ ঘুমের
অস্তিত্ব জানান দিচ্ছিলো তখন। মস্তিষ্কও তাই মানানসই কবিতার দু'লাইন খুঁজে
নিলো এবং আমি তাই বিড়বিড় করে সেটা বলতে থাকি। আচ্ছা কবির নামটা কী? মাইকেল
ড্রেটন? কিছুতেই মনে পড়লো না।
.
প্রচন্ড শীতের রাত। বাইরে তুষারপাত
ঝড়ের ইঙ্গিত বয়ে এনেছে। এসময় মনটা দেশের জন্য কাবু হয়ে গেল। খুব ইচ্ছে
হচ্ছে রাতের খোলা আকাশটাকে বিশ্লেষণ করে কোটি নক্ষত্রের মাঝ থেকে অরুন্ধতী
নক্ষত্র খুঁজে নিই। এই নক্ষত্রটিও স্মৃতি বহন করে আছে। তরী একদিন আমায় ছাদে
বাউন্ডুলে হয়ে হাঁটার সময় কাছে এসে বলেছিলো, "এসো, তারা গুনি।"
.
"ঠিক আছে।"
.
"ঐ যে নক্ষত্রটা দেখছো.. ওটা অরুন্ধতী।"
.
আমি বিড়বিড় করতে থাকি 'অরুন্ধতী' 'অরুন্ধতী'। সেদিনই ঠিক করেছিলাম আমার আর তরীর বিয়ের পর মেয়ে হলে অরুন্ধতী নামটা রাখবো।
.
একদিন সকালে..
.
"নীল।"
.
অপরাজিতা ম্যাডাম কাছে এসে বললেন, "কংগ্র্যাচুলেশন! আমাদের প্রজেক্ট রেডি। কালই আমরা দেশে রওনা হচ্ছি।"
.
"ও আচ্ছা।"
.
এই মুহূর্তে অপরাজিতা ম্যাডাম না থাকলেই বেশ হতো। এখন সকালবেলা। আমার
ধূমপানের সময়। টেরেসে দাঁড়িয়েছি তখনই ম্যাডামের আগমন। আমার রষকষহীন 'ও
আচ্ছা' শুনেও তিনি নড়লেন না। মনে হয় স্টকে আরও কথা জমে আছে আমায় শোনানোর
জন্য। স্টক পরিষ্কার না করে তিনি যাবেন না।
.
"এটা ধরো।"
.
"কী এটা?"
.
"একটা ডায়রী।"
.
"সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু কার?"
.
"আমার।"
.
"আমাকে কেন দিচ্ছেন?"
.
অপরাজিতা ম্যাডাম কিছু না বলে সুন্দর করে হাসলেন। আচ্ছা, তিনি কি সত্যিই
সুন্দর করে হেসেছিলেন নাকি হাসিটাই মনে গেঁথে যাবার মত সুন্দর ছিল? এই
তুচ্ছ প্রশ্ন মনের করিডোরে প্রায় দাপাদাপি শুরু করেছে।
.
অপরাজিতা
ম্যাডাম যেতেই আমি সিগারেট বার করে ঠোঁটের ফাঁকে নিলাম। আচ্ছা, অপরাজিতা
ম্যাডামের সাথে কি অনুরাধার কোনো মিল আছে? কেন জানি মনে হয় আছে। এরকম
অবান্তর ধারণার কারণ অজানা। অনুরাধাকে তো আমি কখনও দেখিনি। অথচ আমি তার
প্রেমে পড়েছিলাম। হাউ রিডিকিউলাস! মনে মনে হাসলাম আমি। কম বয়সে কত উদ্ভট
কাজ করে মানুষ। তরীকে ভালবাসাটাও কি উদ্ভট ব্যাপার ছিল? মনে হয় না। বয়স
কোনো মেজর প্রবলেম নয়। আমার চিন্তাভাবনা যথেষ্ট আধুনিক তাই মানসিক বয়সটাকেই
বেশি প্রাধান্য দিই আমি। আর তাছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোতেও এখন অসম ভালবাসার
প্রায়োরিটি রয়েছে। এটা এখন স্পেশাল ট্রেড। এসব ভাবতে ভাবতে ম্যাডামের
ডায়রিটা হাতে নিলাম।
.
"অনেকটা পথ পাড়ি দেব বলেই তোমার সাথে দূরত্ব মেপে রেখেছি..।"
.
চমকে ওঠার মত একটা লাইন, শুরুতেই লাইনটা আমাকে ধাক্কা দিলো। অপরাজিতা
ম্যাডাম কি আমাকে কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছেন এই ডায়রির মাধ্যমে? আমি ভেতরটা পড়তে
শুরু করি।
.
"১৭ জানুয়ারি, ২০১৭ -- মঙ্গলবার
.
কোনো এক
অজ্ঞাত কারণে আজ আমি রাগত। সেই রাগটা অযথা নীল বেচারার ওপর ঝাড়লাম। তাও
আবার সবার সামনে। বেচারা লজ্জায় পড়ে গিয়েছিল। দেখে আমারই খারাপ লাগলো।
এম্নিতেই তাকে দেখে আমি ইমোশনাল হয়ে পড়ি। কেন এমনটি হয় জানি না। সে যখন
ডেস্কে ফিরে গেল তখন আমি আর কাজে মন বসাতে পারিনি। লাঞ্চ ব্রেকে তাই একসাথে
লাঞ্চ করেছি। ও খুব অবাক হয়েছিল আমার আচরণে। কারণ আমি তেমন সামাজিক নই।
তারপরও সেদিন নিঃসংকোচেই একসাথে আধঘণ্টা সময় লাঞ্চ ব্রেকে পার করেছি। খুব
রোমান্টিক মুহূর্ত ছিল সেটা।"
.
ডায়রি বন্ধ করলাম। যা বোঝার বুঝে
গেছি। সন্ধ্যায় একটা বিচিত্র কান্ড ঘটলো। আগামীকাল ফ্লাইট তাই লাগেজ প্যাক
করে গোছগাছ করছি তখন একটু পোড়া পোড়া গন্ধ পেতে থাকলাম। ঘাড় ঘুরাতেই মাথাটাই
ঘুরে উঠলো। ম্যাডামের ডায়রিটা আগুনে দাউ দাউ করে পুড়ছে। ভৌতিক ব্যাপারে
বিশ্বাস নেই তবু ভৈরবের উৎকন্ঠায় ভেসে গেলাম।
.
ম্যাডাম কেন জানি তার রুমে ডেকেছেন। আমি করিডোর ধরে এগুচ্ছি আর ভাবছি ডায়রির প্রসঙ্গ এলে কী বলব?
.
"নীল। চলো, বাইরে থেকে ঘুরে আসি। এখানে কী একটা নাকি ক্লাব আছে। সেখানে গেলে কেমন হয়?"
.
বাধ্য ছেলের মত রাজি হলাম। ম্যাডামের এরকম ঘুরতে যাওয়ার শখ প্রায়ই হয়। তখন
তিনি আমাকে সঙ্গে নেন। আমি ভাবলাম ঘুরবার প্রেক্ষিতে যদি আগুনে ভস্মীভূত
ডায়রি চাপা পড়ে যায় তো সেটাই ভালো।
.
নর্থ ডাকোটা জায়গাটা কানাডার
কাছাকাছি বলেই হয়তো চারিদিকে এত সবুজ। ঠিক সেরকম সবুজের মাঝে হারালাম আমরা।
মাকড়সার জালের মত কুয়াশা ঝুলে ছিল ইতস্তত। সেটা ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম
দুজন। মনে হচ্ছিল যেন শালবনে আছি আমরা। এম্নি করে চলবার এক মুহূর্তে হঠাৎ
আমার গা ছমছম করে ওঠে। কেন তা জানি না। ম্যাডামের ডায়রি পোড়া রহস্যটাও নাড়া
দিয়ে যায় ভেতরটা। ম্যাডাম তখন অস্ফুটস্বরে বলেন, "ইউ কান্ট সলভ দ্য
মিস্ট্রি।"
.
"কীসের কথা বলছেন?"
.
"এখন তুমি আরও একটা রহস্য দেখতে পাবে।"
.
তৎক্ষণাৎ চেয়ে দেখি অপরাজিতা ম্যাডামের নিশ্চল দেহ চোখের সামনে পড়ে আছে।
তারপর মৃদু কান্নার আওয়াজ। যে কাঁদছে সে অপরাজিতা ম্যাডাম নন, তার আত্মা।
আমি এক মুহূর্তের জন্য হতবিহ্বল হয়ে যাই।
.
"আমি তোমাকে ভালবাসবার সুযোগ পেলাম না।"
.
অপরাজিতা ম্যাডামের শেষ কথাটি অনেকক্ষণ কানে বাজলো।
.
দেশে ফিরবার জন্য প্লেনে উঠতেই মন খারাপ হল। আমার পাশে বসবার কথা ছিল
অপরাজিতা ম্যাডামের। কিন্তু তিনি এখন আমার পায়ের নিচে, প্লেনের কার্গোতে।
কী নিষ্ঠুর বাস্তবতা!
.
দশদিন পর...
.
ফেসবুকের ম্যাসেজ
রেকুয়েস্ট ঘাটতে গিয়ে অনুরাধাকে আবিষ্কার করি। নতুন আইডি থেকে সে লিখেছে,
"ইডিয়ট! রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসটা ফেক ছিল... ব্যক্তিগত কারণে স্ট্যাটাসটা
দিয়েছিলাম। তাই বলে এভাবে কেউ ব্লক দেয়?"
.
চারবছর আগের ম্যাসেজ। আমি কোনো পাত্তাই দিলাম না। জীবনে অপরাজিতাকে পেয়েও হারিয়েছি। কিন্তু তার ভালবাসা থেকে হারাতে চাই না আমি।







0 comments:
Post a Comment