Tuesday, January 2, 2018

আমি পতিতা (পর্ব- ০৩) একজন পতিতার গল্প

আমার বয়স তখন ৮, মাত্র ৩ টা দাত পড়েছে , অন্যদের মতো আমার পরিবার টাও খুব সুন্দর আর হাসিখুশি ছিল, বাবাকে তেমন কাছে পেতাম না, উনি কাজে উদ্দমি মানুষ ছিলেন, তাই মার সাথে আমার খুব ভালো ভাব ছিল ছোট থেকেই, বাবাও আমাকে অনেক ভালবাসতেন, কিন্তু একদিন --?
আমাদের পরিবারে নতুন মানুষ এলো , সে আর কেউ না, আমার নতুন মা, আমার বাবার নতুন বউ....
সেদিন বাবা আমাকে বলেছিল, উনি আমার ছোট মা, উনি খুব ভালো তার সাথে মিলেমিশে থাকতে, তখনো তেমন কিছু বুঝি নি, খারাপও লাগে নি, কিন্তু রাতে যখন আমার মা আমার সাথে ঘুমাতে এলো আর বলল নতুন মা আমার মার ঘরে বাবার সাথে ঘুমাবে তাই মা আমার সাথে ঘুমাবে তখন খুব খারাপ লেগেছিল তার চেয়ে বেশি খারাপ লেগেছিল যখন মাঝ রাতে ঘুম ভাঙার পর বুঝতে পাড়লাম মা আমার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে .....
আমার নতুন মাকে বাবা খুব বেশি ভালবাসতেন , এতোটাই যে বাবা আমাদের কেও ভুলে গিয়েছিলেন , নতুন মার প্রতি ভরসা ছিল বাবার অনেক বেশি, উনি যা বলতেন তাই বাবা বিশ্বাস করতেন...
একদিন মাকে বাবা খুব বকাবকি করতে শুরু করলেন এসব আমার জন্য নতুন কিছু ছিল না, আগেও বাবা মাকে অনেক কটু কথা শুনাতেন তা আমি দেখেছি কিন্তু সেদিন --?
মার খেয়ে আধমরা হয়ে গিয়েছিল আমার মা, আমি সব দেখেছি, কিন্তু চুপ ছিলাম, সাহস ছিল না অতো যে সামনে গিয়ে বলবো ,
-- বাবা, মা নতুন মার ওই স্বর্নের চেইন টা নেয় নি, ওই টা নতুন মা তার বোন কে দিয়ে দিয়েছিল আমি দেখেছিলাম....
এরপর থেকে প্রায়শই বাবা মাকে মারতেন , আমার কিছু বলার থাকতো না , একদিন মা রাতে ঘুমানোর সময় অনেক গুলো টেবিলেট খেয়েছিল আমি জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল ওগুলো ব্যাথার টেবিলেট , কিন্তু পরদিন মার মুখ দিয়ে ফেনার মতো বের হচ্ছিল দেখে বাবা তাকে হাস্পাতাল নিয়ে যায় , ২ দিন পর মা ফিরে আসে, মাকে দেখতে যেতে খুব ইচ্ছে করছিলো আমার কিন্তু বলি নি, দূর থেকে শুনতাম শুধু মা কেমন আছেন....?
আমি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি, আর অনেক কিছুই বুঝতে শুরু করি, তখন বুঝতাম নতুন মা আমাকে পছন্দ করেন না, প্রায়শই বাবা আমাকে ডেকে পাঠায়, আমি নাকি কি কি ভুল করে ফেলি? কিন্তু আমার দুই ভাই --? ওদের কে কখনো কিছু বলেন না বাবা, কিন্তু কেন? পরে জানতে পেরেছিলাম, নতুন মা বার বার আমার নামে বাবার কান ভরাট করে, যা বাবা বিশ্বাস করে, আর আমার ভাইদেরকে উনি আদর করে কারণ কি জানেন? -- কারণ আমি মেয়ে আর আমার ভাইয়েরা ছেলে...
কিছুদিনের মধ্যে আমাদের খাবার টাও ভিন্ন পাতিলে রান্না করা হতো, আমাদের বলতে, আমার আর আমার মার, আমাদের ওতোটা অধিকার ছিল না একসাথে বসে খাবার...
একসময় এমন হল আমার ভাইয়েরাও আমাদের প্রতি খারাপ আচরণ শুরু করে, নানি অনেক বার চেয়েছিল আমাদের তার সাথে নিয়ে যেতে কিন্তু মা যায় নি, কারণ কি? তা আজও আমি জানি না, সেদিন চেয়েছিলাম আমি নানির সাথে চলে যেতে কিন্তু মা কিছুতেই রাজি হয় নি, খুব রাগ লেগেছিল সেদিন , এখনো ভাবি,
-- মা গো, সেদিন যদি নানির সাথে চলে যেতে রাজি হতা তবে তুমি আজ বেচে থাকতা....
এভাবেই কেটে যায় কয়েক টি বছর ,
সেদিন সকালে মাকে খুব ডেকেছিলাম, কিন্তু মা আর উঠে নি, বাবা যখন বলল তর মা আর নেই, বুক টা ধক করে উঠল , কাল রাতে মাকে যখন মারছিল কেন বাবাকে আটকালাম না, রাগে নিজেকে মেরে ফেলতে ইচ্ছে করছিল, আমি শেষ হয়ে গেলাম সেদিন ....
মা মারা যাবার পর, আমার পড়াশোনা ও বন্ধ হয়ে গেলো , কি করার? মার কাজ গুলো যে সব আমাকেই করতে হতো, কাজ করতাম কিন্তু নির্যাতন সে আমি সহ্য করতে পারি নি, সৎ মা, বাবা, ভাইদের অত্যাচার সহ্য করতে পারি নি,
পালিয়ে গিয়েছিলাম বাড়ি থেকে, জমানো কিছু টাকা নিয়ে, অনেক দূরে, জানতাম আমি অনিশ্চিত জীবন কিন্তু তবুও আমি আমার মার মতো মরতে চাই নি আমার কাছে তার চেয়ে বরং রাস্তাঘাটে মরে যাবা ভালো মনে হয়েছিল আমার কাছে, কিন্তু দেখেন আজও আমি জিবিত, আজও আমি দিব্বি বেচে আছি...

 --তারপর?
তারপর শুরু হয় এক নতুন সময়ের, একজন এসে বদলে দেয় আমার ধারনা , কাটিয়ে দেয় আমার ভয়, শিখায় আমাকে,কিভাবে ভালবাসতে হয়?
আমি ছিলাম নদী , যে নদীর পানি ছিল স্থির , সে বাতাস হয়ে এসেছিল আমার জীবনে, করে দিয়েছিল আমাকে বহমান , অতি মাত্রায় বহমান...
-- বুঝলাম না, বুঝিয়ে বল,
সে সকালে আমি বেড়িয়েছিলাম একা, সাথে বেচে থাকার আশা টুকুও ছিল না, রাস্তাঘাট ও তেমন চিনতাম না, তবে একটু ভরসা ছিল, দুপুর হবার আগ অব্ধি কেউ আমাকে খুঁজতে বেরুবেনা , তারা ঘুম থেকেই উঠবে না, ভয় ছিল শুধু গ্রামের লোকদদের নিয়ে, তারা যদি দেখে ফেলে! আবার আমি সেই নরকে যেতে চাইছিলাম না, ভাগ্য সেদিন পাশে ছিল, পাশে নয় যেন ভাগ্য ঠিক আমার পদতলে হাটছিল...
ওড়না দিয়ে চোখ মুখ ডেকে বসে ছিলাম রেল লাইনের উপর, ট্রেনের অপেক্ষা , তখনি তার দেখা, হুম, কে যেন আমার পাশে এসে বসল, ভয় পেয়েছিলাম খুব, ভাইয়ার পাঠানো কোনো দূত নয় তো কিন্তু না, সে ছিল ঈস্বরের পাঠানো এক নতুন জীবন....
-- কোথায় যাবেন?
-- জানি না,
-- ট্রেনের অপেক্ষা করছেন?
-- এখানে কি তাহলে বাসের অপেক্ষা করব?
-- আচ্ছা মেয়ে তো আপনি!
-- ভুল বললাম?
-- না তবে কোনো কথার সজা জবাব কি দেয়া যায় না?
-- জানি না,
-- আপনি কি এমনি নাকি আমার সাথেই এমন করে ----?
-- হুম আমি এমনি, কোনো প্রব্লেম?
-- জি না, ধন্যবাদ
-- ধন্যবাদ দেবার কিছু দেখছি না আমি,
-- তবে সরি,
-- সরি বলার কিছু নেই তো ,কেন এমন জ্বালাচ্ছেন?
-- ওকে ওকে সরি,
-- উফ
তারপর চুপ করে বসে রইলাম, সে ও আর কথা বললেন না, একটু পর খেয়াল করলাম উনি পাশে বসে নাক ডেকে ঘুমচ্ছেন , খুবই বিরক্তিকর, তবু কিছু বললাম না, ইচ্ছে করছিল এখুনি তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে বলি গেট লস্ট ফ্রম মাই আইস, কিন্তু সেতো পুরুষ যদি কিছু করে বসে, তাই ঘাপটি মেরে বসে রইলাম , কিছুক্ষণ পর যা ঘটল তা তো আমি আমার নিজ চোখে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, পুরুষ মানুষ কি এমনও হতে পারে? সত্যি কি তাই?
-- কি হয়েছিল? বলুন,
লোক টি যখন ঘুমচ্ছিল এক ছোট্ট মেয়ে এসে তাকে ডেকে বলল,
-- ভাইজান , ও ভাইজান , কালকাত্তে কিচ্ছু খাই নাই, কয়ডা পুয়সা দিবেন?
লোকটি উঠে ময়লাটে জামা পড়া মেয়ে টিকে কলে তুলে নিলো তারপর কিছুক্ষণ আদর করে পাশের কেন্টিন থেকে দুটো বড় রুটি কিনে দিলো , আর আমি? আমি শুধু থ মেরে এসব দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আমার বাবাকেও যদি ঘুম থেকে তুলে কিছু বলতাম , সেও আমায় লম্বা ধরনের এক ভাষণ দিতো , কিন্তু উনি কোন ধরনের পুরুষ ??
ভাবতে ভাবতে ট্রেন এসে গেলো.....
(চলবে)


রাইটার ::ফাতেমা আহমেদ
পর্ব ::০4

0 comments:

Post a Comment