রোজ সকালে ফজরের নামায পড়েই বাড়ি চলে আসি। আজ সকালে ফজরের নামায পড়ে মসজিদ থেকে বের হতেই।
.
পূর্ব দিক থেকে হালকা বাতাস অনুভব করলাম। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম একটু সকালের মিষ্টি সময়টা রাস্তায় হেটে উপভোগ করি।
.
অনেকটা পথ ঘুরাফেরা করে বাসায় ফিরলাম। ওমনি শুরু হলো সৎ মায়ের কথার জাকুনি আর বকুনি ।
তোমার ছেলে নামায পড়তে যায় নাকি ফোন আলাপ করতে যায়। আমি কিছু বুঝি না আমি কি কচি বাচ্চা।
আজ কয়েক মাস হলো সৎ মায়ের ব্যবহার চেন্জ হয়েছে।
.
২০১৩ সালে গ্যাস ফর্ম ও হাইপেসারের কারনে আমার মা এই পৃথিবী ছেরে চলে যায়।
বাসায় রান্না করার মানুষের কথা ভেবে বাবা দ্বিতীয় বিবাহ করে। বিয়ের এক বছর পর্যন্ত সৎ মায়ের ব্যবহার অনেক সুন্দর ছিলো।
কিন্তু বেশ কয়েক মাস যাবত সৎ মা আমাকে তেমন সহ্য করতে পারে না। বাবার
ব্যবহারেও বেশ কয়েক দিন হলো পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। আমি কোনো কথা না বলে
রুমে চলে আসলাম।
.
দেখছো তোমার ছেলের ব্যবহার ; এই ছেলে তোমার অবর্তমানে আমাকে একদিনও এ বাড়িতে থাকতে দিবে না।
আমাকে দেখলে মুখ কালো করে থাকে আমি সব বুঝি। আজ যদি নিজের মা হতাম তাহলে কি এমন ব্যবহার করতে পারতো।
বন্ধুরা কেউ যদি পায়ে পড়ে ঝগড়া করে ; তাহলে কি তার সাথে পেরে উঠা যায়।
আমিও তো একটা মানুষ কতটা সহ্য করা যায়। চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়ছে। দোষ
নেই ঘাট নেই তবুও শাস্তি পেতে হচ্ছে। তাই নিঃশ্চুপ কান্না করছি।
বাবা অচমকা রুমে এসে আমাকে বকাবাধ্য শুরু করবে এমন সময় দেখে আমি খাটের উপর সুয়ে চুপচাপ কান্না করছি।
বাবা মনে হয় অনেক অভিযোগ ছিলো নিয়ে এসেছিলো। ভেবে ছিলো ইচ্ছে মতো
বকাবাধ্য করবে কিন্তু আমার নিঃশ্চুপ কান্না ও নিরবতার কাছে বাবা হেরে গেলো।
.
ফিরে গিয়ে মাকে বললো অনেক বকেছ এবার শান্ত হও। বাবা ও মা
দুজনেই সকালের নাস্তা করলো। কিন্তু আমাকে ডাক দিলো না। আমি ও কিছু বললাম
না।
কান্না করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। ঘুম ভাঙলো কাওছারের ফোনে।
.
- হ্যালো কাওছার বল! (ঘুম ঘুম ভাবে)
- দোস্তো এখনো ঘুমাচ্ছিলি নাকি।
- হ দোস্তো। তুই কি করিস?
- অফিসে যাই। ফরজের নামায পড়েছিস তো?
- হা পড়েছি বন্ধু। গ্রামে আসবি কবে দোস্ত।
- এই তো কুরবানির ঈদের মধ্যে । আচ্ছা পরে কথা হবে। অফিসের কাছে প্রায় চলে এসেছি। ভালো থাকিস দোস্তো।
- আচ্ছা দোস্তো। তুই ও ভালো থাকিস। আল্লাহ হাফেজ।
.
কাওছার আমার ছেলে বেলার বন্ধু। বর্তমানে এইচএসসি পাস করে মামার কোম্পানিতে
ছোট খাটো একটা জব করছে। কুরবানির ঈদে বাড়ি এসে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে
ভর্তি হবে। আমি পরীক্ষায় ১ সাবজেক্টে ফেল করেছি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে
ভর্তি হবার আশা আমি করি না।
.
কাওছারের ফোন কাটতেই বড় আপু কলে ফোনে রিং বেজে উঠলো।
.
- আসসালামু আলাইকুম আপু। আপু কেমন আছিস?
- ওয়ালাইকুম আসসালাম! আলহামদুলিল্লাহ তুই কেমন আছিস?
- ভালো আছি আপু।
- সানভি তোর কন্ঠটা কেমন যেনো ভাঙা ভাঙা শুনা যাচ্ছে।
- কি বলিস আপু। আমি তো প্রতিদিন কার মতোই কথা বলছি।
- মোটেও না! তোর কন্ঠই বলে দিচ্ছে তুই কান্না করছিস।
- আমি ভালো আছি! আমি কান্না করি নাই তো।
- তুই এখনি আমার বাসায় আসতে পারবি?
- বিকালে আসলে হয় না আপু?
- না, তুই এখনই আসবি।
- আচ্ছা আসতেছি আপু।
.
আপুর বিয়ে হয়েছে প্রায় ৯ বছর হলো। আপুর শশুর বাড়ি আমাদের পাশের
গ্রামেই। দুলা ভাই শহরে ছোট খাটো চাকরি করে। আপু ইচ্ছে করেই শহরে যায়নি।
.
- আম্মু দেখো সান মাম্মা এসেছে সান মাম্মা এসেছে ; বলেই পিচ্চি ভাগ্নেটা
আমার কোলে দৌড়ে আসলো। পকেটে থাকা দশ টাকার লাল নোট ভাগ্নের হাতে দিলাম।
.
পিচ্চি ভাগ্নেটা এই কয়েক মাস হলো হাটতে শিখেছে। সেই সাথে তুতলাতে তুতলাতে
অনেক কথাই বলতে পারে। আমাকে "সানভি" না বলে "সান মাম্মা" বলে ডাকে।
খুব আশ্চর্য কর একটা বিষয় হলো পিচ্চি ভাগ্নেটাকে যখন বুকের কাছে নেই। তখন
আমার বুকটা শীতল হয়ে যায়। পৃথিবীতে আমার কোনো কষ্ট আছে বলে মনে হয় না।
ভাগ্নের মুখে ''সান মাম্মা'' ডাকটা শুনতে অনেক ভালো লাগে।
.
- আব্বু তোমার আম্মু কোথায়?
.
- সান মাম্মা আম্মু ওই রান্না ঘরে!
.
: রান্না ঘর থেকে আপু! ''সানভি তুই রুমে যা" আমি আসতেছি একটু পর।
.
১৫ মিনিট পরে আপু এক ঝুড়ি তেল পিঠা, তাল বরা, পায়েস নিয়ে হাজির।
.
- আপু তোকে এত কিছু বানাতে বলছে কে।
.
: মিষ্টি ভাই আমার কথা না বাড়িয়ে খাওয়া শুরু কর। আমার হাতে আরো অনেক
কাজ পরে আছে ; কাজ গুলো সেরে আসি! তারপর তোর সাথে গল্প করবো।
.
: আপুটাও একটা পাগল। কেনো যে কষ্ট করে এত কিছু রান্না করতে গেছে।
.
- আম্মু আম্মু সান মাম্মা কিছুই খাচ্ছে না। ফিস ফিস করে কি যেনো বলছে।
.
- সরি আব্বু। এই দেখো খাচ্ছি।
- সান মাম্মা তোমার চুল এত বড় বড় কেনো।
- এমনিতেই বড় রাখছি আব্বু।
- আজকের পর থেকে চুল বড় রাখবে না।
- ঠিক আছে আব্বু চুল বড় রাখবো না।
- আম্মু আম্মু সান মাম্মাকে ভাত খেতে দাও।
- না আব্বু আমি ভাত খাবো না।
- তোমাকে ভাত খেতেই হবে সান মাম্মা।
.
: আপু ভাত তরকারি নিয়ে আসছে আর বলছে। সানভি কয়েক মুঠ ভাত খেয়েনে না
লক্ষ্যি ভাই আমার । তোর ভাগ্নেটা যখন এত করে বলছে। আপু পিঠা পায়েস খেয়েই
আমার পেট ভরে গেছে। ভাত কিভাবে খাবো। ওমনি কিছু খেয়েনে ; না হলে তোর
ভাগ্নেটা কষ্ট পাবে।
.
খাওয়া দাওয়া শেষ। আপুর হাতের কাজ ও শেষ। আপু এবার আমার পাশে এসে বসলো।
.
- সানভি এবার বল সকালে কান্না করছিস কেনো।
- আপু আমি কান্না করিনি তো।
.
- ভাগ্নেকে কোলে নিয়ে আমার সামনে মিথ্যা বলা হচ্ছে। তুকে সেই ছোট কাল
থেকে কোলে পিঠে করে বড় করছি আমি। তোর মনে কখন কি হয় ; আমি যদি না বুঝতে
পারি তবে এ পৃথিবীর কেউ বুঝতে পারবে না। তোকে কখনো কি আমি মায়ের অভাব
বুঝতে দিয়েছি? তুই বল। তবুও কেনো আমার কাছে কষ্ট লুকাস।
.
: সকালের সব ঘটনা আপুকে খুলে বললাম।
.
- দেখ ভাই এই তো আর কয়েকটা দিন কুরবানির ঈদ পরেই! তোর দুলা ভাই একটা চাকরির ব্যবস্তা করে দিবে।
.
ঠিক আছে আপু। এবার যে বাড়ি যেতে হবে। বাড়ি থেকে বের হয়েছি অনেক সময় হলো।
.
- সান মাম্মা, সান মাম্মা এটা রাখো।
: ভাগ্নেটা এক হাজার টাকার একটা নোট আমার পকেটে গুজে দিলো।
- না আব্বু আমার টাকা লাগবে না।
- সানভি টাকাটা আমি দিয়েছি। পকেটে রেখেদে। তোর হাত খরচের টাকা শেষ হয়ে গেছে আমি জানি।
- আপু আমার টাকা লাগবে না।
- আম্মু আম্মু সান মাম্মা একটু বেশি পেকে গেছে।
- দেখছিস সানভি আমার ছেলেটাও বুঝে তুই এক লাইন বেশি বুঝিস।
.
: আচ্ছা আপু আজকের মতো আসি। বায় আব্বু।
- সান মাম্মা তুমি একদম বোকা। যাবার সময় বায় বলতে হয় না। বলতে হয় আসি।
.
মুচকি হেসে আপু ও ভাগ্নের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। রাস্তায় হাটছি আর ভাবছি পৃথিবীর সব ভালোবাসা বুঝি এখানেই নিহিত।
.
আপু ও পিচ্চি ভাগ্নেটার ভালোবাসাই এখন পর্যন্ত আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তা না হলে হয়তো এত দিনে একটা অঘটন ঘটিয়ে বসতাম।
.
""দুর্দিন কাটিয়ে পাবো একদিন ; সুদিনের দেখা অপেক্ষা সেই দিনের।""
.
লেখনীর শেষে একটা কথাই বার বার বলতে ইচ্ছে করছে ; আপু তোকে বড্ড ভালোবাসি ;
নিজের জীবনের থেকেও হয়তো বেশি। আর পিচ্চি আব্বু তুমি তো আমার বেঁচে থাকার
প্রেরনা। আমার কলিজার কলিজা আব্বু তুমি।







0 comments:
Post a Comment