বিয়ের এক মাসের মধ্যে অনীক অনুধাবন করল
বিয়ে করাটা তার মোটেই উচিৎ হয়নি। জীবনের
সবথেকে ভুল পদক্ষেপ ছিল বিয়ে করা। বিয়ে
করে সে কঠিন ফ্যাসাদে পড়ে গেছে। রাত নেই
দিন নেই নিধির ঝাড়ি খেতে হয়। শুধু নিধি না। বাড়িসুদ্ধ
লোক আজকাল তাকে উঠতে বসতে ঝাড়ি দেয়।
সবাই অনীকের বিপক্ষে। নিধির পক্ষে।
অনীকের থেকে নিধিই এখন তাদের কাছে
আপনজন। কি আশ্চর্য। এই জন্য প্রেম করে
বিয়ে করা উচিৎ না। প্রেম করে বিয়ে করলে
সম্মান থাকে না। ঝাড়ি খেতে হয় শুধু।
.
এই এক মাসে অনীক সাতদিন ছুটি পেয়েছে।
একদিনও আটটার বেশি ঘুমোতে পারেনি। সাতটা
বাজতেই নিধি চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। ঘুমের
মধ্যে এলার্মের শব্দ শুনতে না পেলেও নিধির
চিৎকার অনীক ঠিকি শুনতে পায়। শুধু নিধি না। নিধির
সাথে সাথে আম্মাও আজকাল যোগ দিয়েছেন।
নিধি যখনই বলে, কি ব্যাপার গন্ডারদের মত এখনো
ঘুমোচ্ছ কেন? কয়টা বাজে দেখেছ? এখনি
ওঠো। উঠে বাজারে যাও। আম্মাও সাথসাথ বলে
ওঠেন, বউমা দেও তো হারামজাদাটার গায়ে পানি
ঢেলে। এত বেলা হয়েছে তার পরেও ওঠে না।
কি ভয়ানক ব্যাপার। এই কথা শোনার পর আর বিছানায়
শুয়ে থাকা যায় না। অনীক লাফ দিয়ে উঠে পড়ে।
নিধির কোন ভরসা নাই।
.
অনীক আজকাল বাজারেও যায়। প্রথমদিকে পচা
সবজি কিনে আনত। আগে কখনো বাজার করে নি
সে। বাজার করা আরেক দুঃসাহসিকতার ব্যাপার।
কোনটার দাম কেমন হতে পারে কিছুই জানে না
সে। তবুও নাকি তাকেই বাজারে যেতে হবে। নিধির
কড়া নির্দেশ। বাবাটাও হয়েছেন কেমন যেন। ছুটির
দিনগুলোতে আগে বাজারে যেতেন। এখন
পেপার নিয়ে বসে থাকেন। সব দায়িত্ব
অনীকের। এটা কেমন কথা। বিয়ে করেছে
জন্য কি সব একাই সামলাবে সে। বাসার কিছু একটা নষ্ট
হলেই অনীককে দৌড়াতে হয়। অথচ বিয়ের
আগে সে পরম সুখে ছিল। অফিস গেছে আর
আসছে। অফিস থেকে এসেই লম্বা ঘুম। এখন
অফিস থেকে এসে ঘুম দেওয়ার জো নেই। এ
কাজ সে কাজ লেগেই থাকে।
.
আজকাল বাড়িতে অনীকের দাম একেবারে চতুর্থ
স্তরের গরু ছাগলের পর্যায়ে নেমে গেছে।
ছোট বোনটাকে আগে ধমকালেই সব কাজ
করে দিত। এখন সে পর্যন্ত ভয় পায় না।
অনীকের চা খাওয়ার অভ্যাস আছে। নিধি বারণ করে
দিয়েছে। দিনে দুকাপের বেশি চা খাবে না।
সকালে এক কাপ, বিকালে এক কাপ। নিধি নিজ হাতে
সেই চা বানিয়ে আনে। নিধির চা পৃথিবীর সবথেকে
সুন্দর চা। কিন্তু সেই চা শুধুমাত্র দুইবেলা বরাদ্দ।
সেদিন দুপুরবেলা অনীক তার ছোট বোন
অর্পিতাকে বলল, ‘এক কাপ চা বানিয়ে দেত। তোর
ভাবী এই সময় গোছলে গেছে। চুপচাপ বানাবি।
বকশিশ পাবি।‘
অর্পিতা রাগী স্বরে বলে উঠল, ‘টাকা দিয়ে
আমাকে কিনতে পারবে না ভাইয়া। ভাবীর বারণ
আছে। দিতে পারব না।‘
চোখ রাঙ্গিয়ে লাভ নেই। ভাবীকে বলে দিব
কিন্তু।
বোনের এই কথা শুনে অনীকের চোখে পানি
চলে এল। অনেক কষ্টে আটকাল। এ তো মহা
সমস্যা। নিজের বাসায় আজকাল নিজেকে চোর
চোর হয়ে থাকতে হচ্ছে।
.
অনীকের একটু সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে।
নিধি আগে থেকেই জানত। অনেক নিষেধও
করেছিল। অনীক শোনে নি। বিয়ের পর না শুনে
উপায় নেই। বাসায় সিগারেট খাওয়া একদম নিষিদ্ধ।
অনীক বাইরে থেকে আসার সাথে সাথেই নিধি
অনীকের শার্ট শুঁকে শুঁকে দেখে। কি মুশকিল।
এই মেয়ের জন্য কিছুই করা যায় না। সেদিন আম্মাও
রাগত স্বরে বললেন, ‘বউমা হারামজাদাটা কি এখনো
সিগারেট খায়।‘
নিধি উৎসাহের সহিত বলল, ‘না মা! কন্ট্রোলে রাখছি।‘
-ঠিক করেছ। সিগারেট খেলেই আমাদের সামনে
এনে দুই গালে দুটা চড় লাগিয়ে দিবে।
.
এইরকম একটা ভয়াবহ আলাপচারিতা শোনার পর বাসায়
আর সিগারেট খাওয়া চলেনা।
.
নিধির সাথে অনীকের কথা পর্বটা বলা যাক। দুইজন
একই পাড়ায় থাকত। একই কলেজে পড়ত। কিন্তু
কেউ কারো সাথে কোনদিন কথা বলে নি।
এইচএসসি বাংলা পরীক্ষার আগের রাত। অনীকের
একটা নোটের প্রয়োজন পড়ল। যে
ফ্রেণ্ডকেই ফোন দেয় বলে দোস্ত পারব
না। নিধিকে বল। ও তোর বাসার পাশেই থাকে। আমি
বের হতে পারব না। অবশেষে নাম্বার যোগাড়
করে অনীক নিধিকে ফোন দিল।
-হ্যালো নিধি
-কে?
-আমি অনীক। একটা নোট লাগত। শুনলাম তোমার
কাছে আছে। দিতে পারবে?
-আচ্ছা বাসার সামনে দাঁড়াও আমি আসছি। কি নোট?
.
এরপর থেকেই কথা বলা শুরু। তুমি থেকে তুই।
সময় যায়। দুজন অনেকটা কাছাকাছি চলে আসে।
বাউণ্ডুলে অনীক অনেক গোছালো হয়ে যায়।
নিধি তাকে গুছিয়ে দেয় ধীরে ধীরে। তারপর?
অনীক ধীরে ধীরে নিধির প্রতি দুর্বল হতে
থাকে। অনীক ভাবে নিধিও হয়ত তার প্রতি দুর্বল।
এভাবেই চলে যায় দিনগুলি। একদিন অনীক হঠাত
বলে বসে, ‘তোকে ভালবেসে ফেলেছি।‘
নিধি অবাক হয়। এই ছেলে বলে কি! অনেক
বোঝায় অনীককে। অনীক বোঝে না।
শেষে একসময় মেনেই নেয় নিধি। মাঝে ঘটে
যায় অনেক কাহিনী। থাক! এতসব বলে কাজ নেই।
.
তুই থেকে তুমি তে আসা ব্যাপারটা অনেক কষ্টকর।
ভালবাসি বাক্য বিনিময় করার পর দুইজন তুমি তুই নিয়ে
অনেক ঝামেলায় পড়ে গেল। ওপাশের মানুষটাকে
তুমি বলাটা অনেক কষ্টকর। লজ্জার বিষয়। কি করিস তুই
থেকে সোজা কি কর তুমি, দুজনই বলে আর
হাসে। লজ্জা পায়। আবার চেষ্টা করে। এরপর
গল্পটা চলতে থাকে। মাঝে কত বাধা বিপত্তি, কত
ঝগড়া ঝাটি। তারপরও দুজনে এক হয়ে থাকে।
অনীক সকালে উঠতে পারত না। নিধি রোজ
সকালে অনীককে বারবার ফোন দিয়ে তুলে
দিত। কি অলস ছেলে। নিধি একবার ফোন দেয়
অনীক ফোন ধরে বলে, ‘এই যে উঠছি আমি।
আহ কি ফ্রেশ লাগছে। গুড মর্নিং।‘
বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। নিধি আবার ফোন দেয়।
সাত আটবার ফোন দিয়ে অনীককে ঘুম থেকে
তোলে। তারপর নিজে রেডি হয়ে ভার্সিটি যায়। এই
মেয়ের এত ধৈর্য কিভাবে কে জানে!
সারাদিন খোঁজ খবর নেয়া চলত। তারপর অনেক দিন
পরপর যখন দেখা হত দুজনের নিধি আস্তে করে
মাথাটা অনীকের ঘাড়ে রাখত। জীবনটা দুজনের
কাছেই রঙ্গীণ লাগত। এত সুখ কেন তাদের!
.
আজকাল আর এইসব সুখের কথা মনে পড়লেই
অনীকের কান্না পায়। এখন উঠতে বসতে নিধি ঝাড়ি
দেয়। বিয়েটা না করে সারাজীবন প্রেম করাই ভাল
ছিল।
.
নিধি চায়ের কাপ নিয়ে অনীকের সামনে দাঁড়াল, ‘কি
ব্যাপার? কি ভাবছ?’
-তোমাকে আজ সুন্দর লাগছে
-এটা ভাবার কিছু হল নাকি?
-কিভাবে বলব সেটা ভাবছিলাম
-বউকে বলতে এত ভাবাভাবির কি আছে? দেখি চশমা
পড়। চশমা না পড়েই কিভাবে বললে সুন্দর লাগছে?
এই ছেলে বড় চাপাবাজ
.
অনীক চশমা পড়ল। নিধিকে আজ সত্যিই সুন্দর
লাগছে। এতদিন এত এত চাপের মাঝে খেয়ালই করা
হয়নি তাকে। বিয়ের পর মেয়েদের বেশি সুন্দর
লাগে হয়ত।
.
নিধি অনীকের পাশে বসল। ঘাড়ে মাথাটা রেখে
বলল, ‘চল আজ ঘুরে আসি।‘
-কোথায় যাবে?
-আগে যেখানে দেখা করতাম
-চিকির বিল?
-উফ ওটা চিকলির বিল। উচ্চারণও করতে পার না।
-হা হা হা! আচ্ছা চল যাই! চিকির বিল। স্যরি চিকলির বিল!
.
লেকের পাশে বসে আছে দুজন মানব মানবী।
লেকের স্বচ্ছ পানিতে দেখা যাচ্ছে দুজনের
প্রতিচ্ছবি। একজন হুট করে রেগে যাচ্ছে। ঘাড়
থেকে মাথা তুলে ঘাড়ে দুটো কিল বসিয়ে আবার
হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরছে। পড়ন্ত বিকেলের
ক্লান্ত একটা সূর্য লেকের পানিতে ভেসে
বেড়াচ্ছে। আজকের আকাশটা পরিষ্কার। সাদা সাদা
মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে।
নিধি মাথাটা তুলে তাকায় অনীকের দিকে। অনীক
স্পষ্ট দেখতে পায় নিধির চোখ ছলছল। তার বুকটা
ধক করে ওঠে। কি আশ্চর্য!! মানুষের সুখের কান্না
এতটা মায়াময় কেন?
.







0 comments:
Post a Comment